ঢাকা শহর কেন বসবাসযোগ্য হইবে না?

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩, ০৬:৩০

ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের সহযোগী সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গত পরশু যখন বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ করিল, তখন কৌতূহলবশত আমরাও ঢাকা শহরের অবস্থান জানিতে আগ্রহী হইলাম। আমরা ভালো ছাত্র নহি, রেজাল্ট যে খারাপ হইবে—তাহা অজানা ছিল না। সুতরাং প্রকাশিত তালিকায় যখন দেখা গেল বিশ্বের বসবাসযোগ্য ১৭৩টি শহরের তালিকায় আমাদের (রাজধানী ঢাকার) অবস্থান ১৬৬তম, তখন আমরা বুঝিলাম ঢাকা সপ্তম হইয়াছে, পিছনের দিক হইতে। আর তখনই সম্পূরক কৌতূহল জাগে, আমাদের পরে আর কোন কোন শহর রহিয়াছে—যাহাদের তুলনায় আমরা ভালো করিয়াছি! সেই সবচাইতে বসবাস-অযোগ্য তালিকায় শীর্ষে রহিয়াছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক (১৭৩তম)। তাহার ওপরে রহিয়াছে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি (১৭২), আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স (১৭১), নাইজেরিয়ার লাগোস (১৭০) ও পাকিস্তানের করাচি (১৬৯)।

সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানী কী করিয়া বসবাসোপযুক্ত হইবে? তাহারা পরিস্থিতির শিকার। লিবিয়ার অরাজক অবস্থাও সকলেই জানেন। অলজিয়ার্স, লাগোস, করাচি শহরগুলি যথাক্রমে আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের। এই দেশগুলি চলিতেছে বিবিধ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক টানাপড়েনের ভিতর দিয়া। সুতরাং তাহারা বসবাস অনুপযুক্ত হইবে, ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। এখন আমাদের বিবেচনায় লইতে হইবে কোন কোন সূচকের ভিত্তিতে ইআইইউ এই তালিকা তৈরি করিয়াছে? জানা গিয়াছে, এই তালিকা তৈরির নেপথ্যে পাঁচটি সূচক রহিয়াছে। সেইগুলি হইল—স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। প্রতিটি সূচকের শিরোনাম দেখিয়াই বুঝা যায়, ‘প্রশ্নগুলি’ কঠিন, সুতরাং ‘উত্তর’ও খুব বেশি ভালো হইবার কারণ নাই। এই জন্য আমরা (ঢাকা) স্থায়িত্বে পাইয়াছি মাত্র ৫০, স্বাস্থ্যসেবায় ৪১ দশমিক ৭, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪০ দশমিক ৫, শিক্ষায় ৭৫ এবং অবকাঠামোতে ২৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট। শিক্ষায় আমরা মোটামুটি ভদ্রস্থ নম্বর পাইয়াছি বটে, তবে আমাদের শিক্ষারও যে কতখানি উন্নতি হইয়াছে, তাহা আমরা ব্যাবহারিক জীবনেই দেখিতে পাই। আর বাকিগুলির দৈন্য নম্বর বলিয়া দেয় স্বাধীনতার ৫২ বছর পার করিবার পরও আমরা কোন তিমিরে পড়িয়া আছি! অথচ আমরা উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উন্নতিতে অমুক অমুক দেশকে পেছনে ফেলিয়াছি বলিয়া প্রায়শই আত্মশ্লাঘায় ভুগি।

আত্মতুষ্টি ভালো, কিন্তু আত্মসমালোচনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাইয়াছে বিধায় আমরা এখন প্রায়শই দেশের বাহিরে ঘুরিতে যাই। ইহা ছাড়াও প্রবাসে প্রায় ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাহারা ছড়াইয়া-ছিটাইয়া রহিয়াছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ বাসযোগ্য শহর হইল, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। ভিয়েনার পর তালিকার শীর্ষদশে রহিয়াছে যথাক্রমে— ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, সিডনি, কানাডার ভ্যানকুভার। ষষ্ঠ অবস্থানে রহিয়াছে, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, যৌথভাবে সপ্তম অবস্থানে আছে কানাডার ক্যালগেরি ও সুইজারল্যান্ডের জেনেভা। নবম অবস্থানে রহিয়াছে, কানাডার টরন্টো এবং যৌথভাবে দশম অবস্থানে রহিয়াছে জাপানের ওসাকা ও নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। এই শীর্ষদশেও অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করেন। অনেকে সেই সকল শহরে ঘুরিতে যান। তাহারা নিশ্চয়ই ঢাকা শহরে আসিয়া দেখেন ঐ সকল শহরের সঙ্গে ঢাকার কী কী তফাত রহিয়াছে। আমাদের যাহারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন, তাহারাও হরহামেশা বিশ্বের এই সকল উন্নত শহরে যাতায়াত করেন। সুতরাং ঢাকাকে কী করিয়া একটি বসবাসযোগ্য শহর হিসাবে তৈরি করা যায়, তাহার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা খুব কঠিন কিছু নহে। আমাদের সম্মুখে ভালো দৃষ্টান্তের তো অভাব নাই। তাহা হইলে অভাব কীসের? অভাব কি সদিচ্ছার? নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বৃত্তায়ন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তির যেই অপসংস্কৃতি চলিতেছে আমাদের মহানগরে, তাহার তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি হয় নাই। এই মহানগরীতে কত মানুষ বসবাস করিবার উপযুক্ত তাহারও তো একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন। কারণ অসংখ্য মানুষের চাপে যে কোনো ভালো পরিকল্পনা ও নাগরিক সুবিধা নষ্ট হইতে বাধ্য। সুতরাং আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করিতে হইবে—শীর্ষদশ খারাপ শহরের শিরোপা আমরা প্রতি বত্সর গ্রহণ করিব, নাকি ঢাকাকে ক্রমশ বসবাসোপযুক্ত শহরে পরিণত করিব।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন