রাষ্ট্রে নাগরিকের সুখ

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩, ০৪:৫০

আগের নিবন্ধে হ্যাপিনেস আদায়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলাম। প্রকৃত সুখ কোনো যন্ত্র দিয়ে পরিমাপযোগ্য নয়। আদালতে যাওয়ার আগে একজন নাগরিকের প্রথমেই ভাবা উচিত, কতটুকু বা কোন অধিকার কীভাবে পুনর্বহাল হলে সে নিজে হ্যাপি বা সুখী হবে। জাতীর জনকেরা পারসুয়েট অব হ্যাপিনেস বা সুখের প্রাপ্তির ব্যাপকতা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে গেছেন, তা বিচার করতে হবে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫ থেকে ছয়শ বছরের প্রাচীন বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক, কবি, আইনপ্রণেতা, রাষ্ট্রনায়ক ও তত্কালীন সর্বোচ্চ জ্ঞানী মহামানব সোলনের মতে, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কোনো মানুষই প্রকৃত সুখী নয়। আরো প্রাচীন রোমান দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিনের মতে, প্রকৃত হ্যাপিনেস বা সুখ মানুষের পার্থিব জীবনে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই প্রকৃত হ্যাপিনেস অলৌকিক। মূলত আমেরিকার জনকেরা সেই অলৌকিক সুখবোধকে নিজেদের মতো করে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছেন, রাষ্ট্র কর্তৃক মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন, ঐকান্তিক ইচ্ছা ও মনোবাসনার পূর্ণতার গ্যারান্টি দিয়ে।

১৬০৭ সালে ব্রিটিশ রাজা কিং জর্জের সময়কালে কিছু ব্রিটিশ নাগরিক স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা ও কথা বলার উদ্দেশ্যে তাদের কথিত ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বা নতুন পৃথিবী হিসেবে বর্তমান আমেরিকার গোরাপত্তন করেছিলেন। ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে সেই ফাদার অব দ্য নেশনেরা পুরোনো দার্শনিক সোলন ও অগাস্টিনের সুখ বিষয়ে আধ্যাত্মিত্বপ্রসূত ধারণা ও চিন্তাকে পালটে দিয়ে, হ্যাপিনেসকে বাস্তবপ্রাপ্তি হিসেবে সমুন্নত করতে মানুষের বেশ কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের গ্যারান্টি দিয়ে সুখের বাস্তবায়ন চেয়েছেন, যা রাজনৈতিকভাবে একটি নতুন চমক ও ধারণা তৈরিতে মানুষের মানবিক জগত্, রাজনৈতিক ও চিন্তা-চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

জাতীর জনকেরা অষ্টাদশ শতাব্দীর ধার্মিক খ্রিষ্টানদের হতাশা বা অসম্ভবকে দূরে রেখে মানবিক প্রশান্তির চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তারা বলেছেন যে, প্রতিশোধ গ্রহণকারী গড বা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা বা দুর্ভাগ্যের কশাঘাত মানুষের সুখপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম নয়, করতে পারে না। মানুষের অদম্য ইচ্ছা, চেষ্টা, জ্ঞান, বুদ্ধির চর্চা ও সঠিক পরিকল্পনাই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নিজের সুখ করায়ত্ত করতে সক্ষম। সৃষ্টিকর্তা মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজেও খুশি হন। তাই সুখ শুধুই ধর্মীয় বিশ্বাস বা ভাগ্যের বিষয় হতে পারে না। এটা মানুষ নিজেরা নিজেদের প্রচেষ্টা, শ্রম ও কর্মের মাধ্যমেই আয়ত্ত করতে সক্ষম। তাই জাতির জনকেরা রাজনৈতিক সরকার বা রাজনৈতিক বিজ্ঞানকে সেই সুখ অর্জনের বাহন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

জন এডামসের মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্বই হচ্ছে তার জনগণের সুখী জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া। সেটি জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দানের মাধ্যমে। তারই বন্ধু এবং রাজনৈতিক অনুসারী জন মেডিসনের মতে, রাষ্ট্রের বা সরকারের মূল দায়িত্ব ও কাজই হলো নাগরিকদের অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের সুখ বা হ্যাপিনেসের নিশ্চয়তা দেওয়া। যার মূল এবং প্রাথমিক বিষয়টিই হলো তার নিজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়া। বেআইনি বা আইনশৃঙ্খলাহীনতা থেকে রক্ষা করা, আইনের শাসন বলবত্ রাখা, নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে চলতে, কথা বলতে, ভোট দিতে দেওয়া। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ও চিকিত্সার নিশ্চয়তা প্রদান করা। অন্যায় শাসক বা একনায়কতন্ত্র থেকে রক্ষা করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের চেয়ে নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকারকে আইনের শাসনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাখা।

নাগরিকের মৌলিক অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা প্রদানে তারা রাষ্ট্র ও সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে বলেছেন, যাতে নাগরিক তার জীবনকে স্বাধীন-সার্বভৌমভাবে উপভোগ করতে পারে। সেই উপভোগের বিষয়টা ব্যক্তিগত হলেও এতে রাষ্ট্র ও সরকারের সংশ্লিষ্টতা ও কর্তৃত্ব অপরিহার্য বলে মনে করেছেন বেনজামিন ফ্রাংকলিন। তিনি মনে করতেন,  মানুষের ভাগ্য, নিজস্ব যোগ্যতা বা চেষ্টাই কেবল তার আর্থিক তথা আয়, উপার্জন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধান করতে যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সরকার ও সমাজব্যাবস্থার সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা অপরিহার্য। আর্থিক সচ্ছলতা বা টাকাপয়সাই কেবল সুখ নিশ্চিত করতে পারে না। তবে জীবনধারণ, উপভোগ ও সুখীজীবন পরিচালনার জন্য আয় উপার্জন অপরিহার্য আর রাষ্ট্র ও তার সরকার তার ব্যবস্থা করতে বাধ্য।

অন্যতম জাতির জনক বেনজামিন ফ্রাংকলিন ১৭৩২ শতাব্দীতে তার বক্তব্য ও   লেখায় বলেছেন সুখী হতে অর্থের পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য যেমন জরুরি, তেমনি মানবিক মর্যাদাবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসাবে জনহিতকর কাজ, পরোপকার, অপেক্ষাকৃত গরিব ও অসহায়দের সহায়তা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ এ সংক্রান্ত কর্ম সম্পাদন করার প্রয়োজনীয় পরিবেশ, সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেডারেল সরকারকে বাধ্য করাটাও আবশ্যক। এভাবেই মানুষ ব্যাক্তিগতভাবে যেমন সুখী হতে পারবে, তেমনি সমাজেও সুখের আবহ তৈরি হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা ও মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের সুখ প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করবে।

ফরাসি দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আমেরিকান অষ্টাদশ শতাব্দীর গণতন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, একজন নাগরিক কেবল হাজারো চেষ্টা করেই নিজে নিজে সুখী হতে পারে না, যদি না সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার তার  নিশ্চয়তা, প্রদান করে।

লেখক: বাংলাদেশি আমেরিকান আইনজীবী

ইত্তেফাক/এমএএম