নতুন মুদ্রানীতি ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৩, ০৪:৩২

২০২৩-২৪ অর্থবছরের (জুলাই-ডিসেম্বর-২৩) প্রথমার্ধের জন্য বিগত ১৮ জুন-২০২৩ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিক মার্কেট ইকোনমিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সময়োপযোগী ও দিকনির্দেশনামূলক। ঘোষিত মুদ্রানীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রেপো হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে, এতে এই হার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, সেই সঙ্গে রিভার্স রেপো হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ২. ব্যাংক ঋণে বেঁধে দেওয়া ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অস্থির ডলারের বাজার সুস্থির করতে টাকা-ডলারের বিনিময় হারও বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

৩. বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বেশ খানিকটা কমানো হয়েছে, নামিয়ে আনা হয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশে, যা গত জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্য ধরা ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। ৪. মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে এবার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। ৫. ‘নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার সীমাও তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সুদহার সীমার বদলে প্রতিযোগিতামূলক ও বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হবে, যদিও তার মার্জিন থাকবে, টাকার সরবরাহ কমিয়ে এনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাটাই উদ্দেশ্য। ৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবারের মুদ্রানীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি জোর দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে চার ধরনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক মুদ্রানীতি প্রচলিত আছে। যেমন সুদহার, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা সরবরাহ এবং বিনিময় হার টার্গেটিং। বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন ‘মূল্যস্ফীতি টার্গেটিং’ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছিল, এবার ‘সুদহার টার্গেটিং’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুদ্রানীতিতে এটা কাঠামোগত পরিবর্তন বলা যায়। ৭. নতুন মুদ্রানীতিতে টাকার চাহিদা কমাতে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ঋণের সুদহারের যে ৯ শতাংশ ক্যাপ ছিল, তাও তুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়মে ব্যাংকঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ১২ শতাংশ। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১২ শতাংশ। এসএমই ও ভোক্তাঋণের তদারকি খরচের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো ১ শতাংশ বেশি সুদ আরোপ করতে পারবে। ৮. নতুন সুদহার ব্যবস্থা হলো ‘স্মার্ট’ তথা শর্ট টার্ম মুভিং অ্যাভারেজ রেট। ১৮২ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের সঙ্গে আপাতত সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ করিডর বা সীমা দেওয়া থাকবে। বর্তমানে ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এর মানে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার হবে ১০ দশমিক ১০ শতাংশের মধ্যে। ৯. নীতি সুদহার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহারের করিডর প্রথা চালু হচ্ছে। এখন স্পেশাল রেপোকে বলা হবে স্ট্যান্ডার্ড ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ), নীতি সুদ ও রিভার্স রোপোকে বলা হবে স্ট্যান্ডার্ড ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)। ১০. সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪৩ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে প্রাক্কলন ছিল ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়েছে। ১১. বাংলাদেশ ব্যাংক এখন থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব ‘দুই পদ্ধতিতেই’ করবে অর্থাত্, আগে যে পদ্ধতিতে করা হতো, সেভাবেও করা হবে, আবার বিপিএম ৬ পদ্ধতিতেও করা হবে। ১২. ডলার সাশ্রয়ে টাকার পেকার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কার্ড দিয়ে দেশে কেনাকাটা, বিভিন্ন বিল পরিশোধ ছাড়াও ভারত ভ্রমণের সময় রুপিতে খরচ করার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশিরা। এতে ৬ শতাংশের মতো খরচ কমবে। ১৩. নতুন মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই দেশে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদসীমা উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় ঠেকাতে ডলার বিক্রি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হলে বাজারদরে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। রিজার্ভের হিসাবায়নের ক্ষেত্রেও আইএমএফের বেঁধে দেওয়া শর্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেক্ষেত্রে দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে। আবার রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোও বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, চলতি অর্থবছরেই টাকার প্রায় ১৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন, রিজার্ভের অস্বাভাবিক পতনসহ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৩০ শতাংশও পেরোয়নি। বিপরীতে দেশের মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রিজার্ভ মানি, ব্রড মানির মতো মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকগুলো অর্জনের হারও তুলনামূলকভাবে কমেছে। ডলার-সংকটের কারণে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ ঋণ প্রাপ্তির অন্যতম শর্ত হলো ব্যাংকঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এজন্য একটি করিডরভিত্তিক সুদহার প্রণয়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ। নতুন মুদ্রানীতিতে আইএমএফের সুপারিশের বাস্তবায়ন ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদের সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডর দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডর যুক্ত হলে ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অর্থাত্ আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশের বেশি হবে। আইএমএফের সুপারিশ মেনে রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোরও সংস্কার আনা হয়েছে। এসব হাতিয়ার ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, কলমানির সুদহার যাতে অস্বাভাবিক বেড়ে না যায়, সে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোকে এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে অর্থের চাহিদা তীব্র হলে ব্যাংকগুলো সহজেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করতে পারবে।

এবার সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ভঙ্গি অনুসরণ করা হয়েছে, যা কিছুটা সংকোচনমুখী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে সুদ হারে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়, তাকে বলে ব্যাংক রেট। এসব নীতি হারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য প্রবাহ আর অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে বাজেটে ঘোষিত সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধির উপযুক্ত আর্থিক পরিবেশ তৈরি হয়, আবার বাজারে পণ্যমূল্যও সহনীয় মাত্রায় রাখা যায়। সরকার বাজেটে যে নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি ঠিক করে, তা বাস্তবায়নের জন্য সহায়ক আর্থিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে অর্থের প্রবাহ ঠিক রাখাই মুদ্রানীতির লক্ষ্য। এমনভাবে এই নীতি সাজানো হয়, যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয়। সে হিসাবে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অনেক সংস্কার আনা হয়েছে, যা আর্থিক খাতের জন্য শুভ লক্ষণ বলে প্রতীয়মান হয়। প্রস্তাবিত মুদ্রানীতিতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এনে খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমানোর বিষয়টি উল্লেখ হয়নি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন আসছে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নেও খেলাপি ঋণ বাঁধা, অথচ দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ আগের তুলনায় কমলেও এই ঋণ উত্পাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, কিংবা এই ঋণের টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়। খেলাপি ঋণের ছোবল থেকে ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করার জন্য মানবিক আচরণে পরিবর্তন জরুরি, যদিও বিষয়টি রাজনৈতিক।

মুদ্রানীতির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে, যা বর্তমানে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এ খাতে অনৈতিক (Unethical) কাজগুলো সার্বিক অর্জনকে কলুষিত করছে, যা অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু। এ ব্যাপারে সুশাসনের বিষয়টি আর্থিক খাতে সফলভাবে প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যাপারে তপশিলি ব্যাংকগুলোর আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে নজরদারি (monitoring) বাড়ানো আগের মতো অব্যাহত রাখে, তাহলে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের হার অনেকাংশে বাড়বে। তা ছাড়াও এই খাতকে গতিময় করতে শুধু অর্থঋণ আদালতই যথেষ্ট নয়, বরং বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/ইআ