বাংলাদেশ বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটিবিচ্যুতি!

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০০

সাম্প্রতিক কালে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে উপর্যুপরি যান্ত্রিক বিপর্যয় দেখা দিয়াছে । ইহা একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ছাড়া আর কিছুই নহে । খবরে প্রকাশ, বহরের ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে বোয়িং মডেলের বিমানসমূহে অধিকতর কারিগরি ত্রুটি প্রত্যক্ষ করা গিয়াছে। সম্প্রতি টরন্টো হইতে আগত ২৫৬ জন যাত্রী লইয়া একটি ফ্লাইট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালিতে জরুরি অবতরণ করে এবং যাত্রীগণ দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকা পড়িয়া অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পতিত হন। ইহার পূর্বে ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে আটটি বোয়িং উড়োজাহাজে ইঞ্জিনের কম্পন, টয়লেট ফ্লাশ ব্যবস্থার বিকল ও উইং ফ্ল্যাপের ত্রুটি দেখা দিয়াছিল । এমনকি ২০২৪ সালে উড্ডয়নকালে একাধিক বার উড়োজাহাজের ফ্রন্ট উইন্ডশিল্ডে ফাটল ধরা পড়ে এবং ভারতের আকাশসীমা হইতে ফ্লাইট ফিরাইয়া আনিতে হয় । এই সকল পৌনঃপুনিক দুর্ঘটনার কারণে বিমানের অন-টাইম পারফরম্যান্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে এবং বহরের বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড থাকায় ফ্লাইট শিডিউলে দেখা দিতেছে বিপর্যয়।

বিশেষজ্ঞগণ বলিতেছেন, এই সকল যান্ত্রিক ত্রুটির মূলে রহিয়াছে চরম অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে মার্জনাহীন অবহেলা। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিয়ম লঙ্ঘনপূর্বক নির্ধারিত ‘চেক’ ও ‘সার্ভিসিং’ ছাড়া তড়িঘড়ি করিয়া মাত্র আড়াই ঘণ্টায় মেইনটেইন্যান্স লগ সই করিবার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া দূরবর্তী স্টেশনগুলিতে অতিরিক্ত যন্ত্রাংশের কোনো মজুত না থাকায় সাধারণ ত্রুটি সারাইতেও ঢাকা বা লন্ডন হইতে পার্টস আনিতে হইতেছে । ইহা আন্তর্জাতিক ট্রানজিটে সৃষ্টি করিতেছে এক চরম বিড়ম্বনা। চালক ও প্রকৌশলী নিয়োগেও রহিয়াছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। এমনকি পাইলট নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিবিধান লঙ্ঘন করিয়া পর্যাপ্ত একক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়াই লাইসেন্স প্রদান করা হইয়াছে। আবার বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলে বৈশ্বিকভাবেও উচ্চতা হ্রাস পাওয়া ও উইন্ডশিল্ডে ফাটলের ন্যায় নির্মাণগত ত্রুটির (Manufacturing defects) অভিযোগ তুলিতেছেন কেহ কেহ ।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশ বিমানকে বহরের সর্বপ্রকার বোয়িং উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ও কারিগরি মান যাচাইয়ে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক অডিট পরিচালনা করা আবশ্যক। বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিতে অনতিবিলম্বে খুচরা যন্ত্রাংশের ডিপো স্থাপন করা জরুরি। ইহাতে উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড হইবার ঝুঁকি হ্রাস পাইবে। রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি দেখা দিলে দায়ী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। পাইলট ও টেকনিশিয়ান নিয়োগে সর্বপ্রকার অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি দূর করিতে হইবে। নূতন উড়োজাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারী সংস্থার নির্মাণগত ত্রুটি ও দায়বদ্ধতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করিতে হইবে।

অবশ্য শুধু বোয়িং নহে, অন্যান্য কোম্পানির বিমানেও মাঝেমধ্যে ত্রুটি দেখা দেয় । যেমন—গত বৎসর মে মাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ড্যাশ ৮-৪০০ মডেলের উড়োজাহাজের ঢাকা মহাশূন্যে খসিয়া পড়ে। তবে পাইলটের নিপুণ দক্ষতায় সেই বিমানটি সফলভাবে অবতরণে সক্ষম হয় । যদিও উন্নত দেশসমূহে বিমান নিরাপত্তা মান অনেক উঁচু, তথাপি সেই সকল দেশেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার নজির বিদ্যমান। এমনকি উড়োজাহাজের চাকা খোলা বা ইঞ্জিন বিকল হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিতে দেখা যায়। তবে উন্নত কারিগরি ব্যবস্থা ও পাইলটদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহারা বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াইতে পারেন । ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই শুধু বিশ্বে ছয়টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটে যাহাতে প্রাণ হারায় ২৩৬ জন। প্রযুক্তিগত ত্রুটি (ইঞ্জিন, কন্ট্রোল গিয়ার সিস্টেম বা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার ইত্যাদিতে সমস্যা), পাইলট বা ক্রুদের ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল বুঝাবুঝি, অপারশেনগত ত্রুটি বা তাহাদের ঘুমজনিত অবহেলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ- দুর্বিপাক ইত্যাদি কারণেও বিমান দুর্ঘটনা ঘটিতে দেখা যায় ।

যাহা হউক, যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিমান দুর্ঘটনা ঘটুক ইহা আমরা কোনোমতেই কামনা করিতে পারি না। এই জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনীর কোনো বিকল্প নাই। বিশেষ করিয়া, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল শাখার কর্মীদের নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে তাহাদের জবাবদিহিতা। সর্বোপরি সকল উড়োজাহাজের নিয়মিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশের দ্রুত প্রতিস্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন ।

ইত্তেফাক/এনএন