বাংলাদেশে মাদক একটি ভয়াবহ ও মহামারি আকার ধারণ করেছে। সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের মাদক অনলাইন এবং অফলাইনে বিক্রি হচ্ছে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মাদক সেবনের জন্য মাদক বিক্রেতারা জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে কিংবা মাদকাসক্তরা নিজেরা পার্ক কিংবা কোনো স্থান দখল করে মাদক সেবন করছে। যা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সামাজিক অবস্থান, সম্মান এবং মর্যাদা বজায় রেখে চলাচলের ক্ষেত্রে বাধাবিঘ্নতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে মাদকের এত ভয়াবহতা তৈরি হলো কীভাবে? দীর্ঘসময় ধরে মাদক কারবারিরা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে সারা দেশে মাদকের আখড়া তৈরি করে তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের মাদকাসক্ত করেছে এবং বর্তমানেও করছে। এখন অনলাইনে ইয়াবাসহ আধুনিক মাদকগুলো বিক্রি হচ্ছে এবং সেগুলো কেউ ক্রয় করতে চাইলে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মাদকের সহজলভ্যতা মাদকের মহামারির পেছনে অন্যতম কারণ।
মাদকাসক্তি একটি জটিল এবং জীবন ধ্বংসকারী সমস্যা, যা বর্তমানে অন্যতম জাতীয় সমস্যা এবং এই সমস্যার সমাধান বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় অবস্থান হলো জিরো টলারেন্স নীতি। কিন্তু আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রাষ্ট্র যে কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করে সেক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতির যথার্থ অনুসরণ দৃশ্যমান হতে দেখি না। জিরো টলারেন্স নীতি বলতে যা বোঝায় তা যদি সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করা যায় তখন মাদকের এই মহামারি কিংবা মাদক কারবারিদের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আমরা লক্ষ করছি যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে মাঠ পর্যায়ের মাদক বিক্রেতা কিংবা মাদকাসক্তদের গ্রেফতার করছে। এদের গ্রেফতার করার পাশাপাশি মাদক বাণিজ্যের পেছনে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পুলিশের বক্তব্য প্রক্রিয়াগতভাবে ঠিক কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পুলিশ মাদককারবারীদের তালিকা তৈরি ও অভিযান পরিচালনা করছে, মাদক উদ্ধার করছে, গ্রেফতার করছে, মামলা দিচ্ছে, আইনের মুখোমুখি করছে। কিন্তু এতে মাদকের ভয়াবহতা কমছে না কেন? এর অন্যতম কারণ হলো গ্রেফতারকৃতরা অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়।
আমাদের সীমান্ত হয়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার কিংবা এয়ারপোর্ট হয়ে সবচেয়ে আধুনিক এবং অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টিকারী মাদক প্রবেশ করছে। এই জায়গাতে আমাদের আরও বেশি সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন এবং এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, মাদকের ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে মাদকের জোগান নিয়ন্ত্রণ করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বরং আমরা উলটো পথে চলছি। আমরা চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে জোগানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। এটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব নয়।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদমূলক কর্মসূচিকে বেগবান করা এবং মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধ কর্মসূচি বা ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, আজকে যিনি মাদকাসক্ত তিনি আগামী দিনে পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের জন্য বোঝা এবং যে বোঝা বহন করার মতো সামর্থ্য আমাদের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের কারোই নেই ।
লেখক : সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ গবেষণা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

