সেকালের সাহিত্য-সাময়িকী ও  রেডিওতে ঈদ উদযাপন

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৩, ০০:০২

ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গে ঠিক কবে থেকে ঈদুল আজহার জামাত কিংবা পশু কোরবানির প্রথা চালু হয়, তা নিয়ে নানা মনীষী তাদের রচনায় নানা বয়ান করেছেন। শুধু ধর্মীয় প্রথা পালনই নয়, কোরবানির ঈদ নামটিও ঈদুজ্জোহা, ঈদ-উল-বকর বা বকর ঈদ প্রভৃতি নামে অভিহিত হয়েছে। সময়ে সময়ে ‘ঈদ-উল-আযহা’ নামেও আখ্যায়িত হয়েছে কোরবানির ঈদ। অধ্যাপক আব্দুল গফুর তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার কালের কথা’য় উল্লেখ করেন, ‘কোরবানির ঈদ বা অন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া সাধারণত গরু বা বকরি জবাই করা হতো না। হাট-বাজারে গরু-ছাগলের মাংসও এভাবে বিক্রি হতো না তখন। বাড়িতে মেহমান এলে সাধারণত মুরগি জবাই করেই তাদের আপ্যায়ন করা হতো।’ ইংরেজ ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের বক্তব্যে এটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মতে, ‘১৮৩৮ সালে ঢাকা শহরে বণিকদের মধ্যে চার-পাঁচজন মুসলমান ও সমসংখ্যক খ্রিষ্টান ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন হিন্দু। এখনকার মতো ঘরে ঘরে কোরবানি দেওয়ার মতো সমাজে তত বেশি বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন না।’ ঐ সময়কার ঈদের ব্যাপকতা সম্পর্কে আরো স্পষ্ট হওয়া যায় ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকা থেকে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি ছুটির তালিকায় দেখা যায়, হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টান পর্বের জন্য ঘোষিত মোট ২৩ দিন ছুটির মধ্যে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ছিল মাত্র এক দিন।

আঠারো, উনিশ ও বিংশ শতক—এই তিন শতাব্দীতে ঈদের  কোরবানি, ঈদের নামাজ, চাঁদ দেখার মতানৈক্য, এমনকি দাঙ্গার বিষয়ে অনেক পুস্তিকার বিবরণ পাওয়া যায়। সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর লেখা ‘ঈদুল আজহা’ গ্রন্থ থেকে তার ইমামতিতে ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের বিষয়ে জানা যায়। আধ্যাত্মিক সিদ্ধপুরুষ খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর লেখা ‘ভক্তের পত্র’ শীর্ষক গ্রন্থে (পত্রের সংখ্যা ৬৬, আগস্ট, ১৯২১) সেকালের ঈদুল আজহার বর্ণনা পাওয়া যায়। নবাবদের আমলে আহসান মঞ্জিলে কোরবানির ঈদ পালনের ব্যাপারে তারবার্তা আসত দিল্লি থেকে। আর ঢোল পিটিয়ে তা জানিয়ে দেওয়া হতো পুরো ঢাকাবাসীকে। চাঁদ দেখা নিয়ে মতানৈক্য জানা যায়, লেখক অনুপম হায়াতের ‘ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে উল্লিখিত ১৯২২ সালের ৩ আগস্টের দিনলিপি থেকে। সে বছর ঢাকা শহরে শুক্র ও শনিবার দুই দিন ঈদ উদ্যাপিত হয়। ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালে ঈদ উদযাপনের তথ্যও সেখানে সন্নিবেশিত রয়েছে। 

অধুনালুপ্ত রেডিও তো তখনকার দিনে কল্পনাও করা যেত না। অত্যন্ত অভিজাত পরিবার বা কোনো বিখ্যাত দোকানে কেবল রেডিওর দেখা  মিলত। সে সময় পুরো ভারতবর্ষের সব রেডিও স্টেশনের পাক্ষিক অনুষ্ঠান শিডিউল প্রকাশ পেত ইংরেজিতে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর একমাত্র স্টেশন ছিল ঢাকায়। নাজিমুদ্দিন রোডের একটি বিল্ডিংয়ে। এখন সেখানে বোরহান উদ্দিন কলেজ অবস্থিত। ১৯৩৮ সালের দি ইন্ডিয়ান লিসেনার পত্রিকার ২২ জানুয়ারি সংখ্যায় দেখা যায়, ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ১৩ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানসূচিতে বিশেষ রেডিও অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আয়োজন ছিল কাসিদার। ঈদ উপলক্ষ্যে কাসিদার সেই আসর মাতানোর দায়িত্বে ছিলেন রাধারাণী, হরিমতী ও কমলাবালা ত্রয়ী। সংগীতের জগতে তখন ছিল আব্বাসউদ্দীন, কমলাবালা, রাধারাণী, হরিমতী, ইন্দুবালা ও আঙ্গুরবালাদের রাজত্ব। হরিমতী ও রাধারাণীর কণ্ঠে তখন নজরুলের গজল বেজে উঠত। 

ভাষাসংগ্রামী মাহাবুব উল আলম চৌধুরীর (১৯২৭-২০০৭) ‘স্মৃতির সন্ধানে’ শীর্ষক বইয়ে তার শৈশবের কোরবানির স্মৃতি তুলে ধরেছেন। ঈদ স্মৃতিচারণ করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘কাল নিরবধি’তে। তিনি লিখেছেন, ‘বকরীদে আমরা প্রতি বছর কুরবানি দিতাম না। মাঝে মাঝে তা বাদ পড়ত ভক্তির অভাবে অতটা নয়, যতটা সামর্থ্যের অভাবে। বড়োরা চেষ্টা করতেন পশু জবাই থেকে আমাদের আড়াল করতে। আমরা ছোটোরা ততোধিক উত্সাহে ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে জবাই দেখে ফেলতাম। দেখার পরে কিন্তু অনেকক্ষণ বিষাদে মন ছেয়ে যেত। তবে শেষ পর্যন্ত এই বিষণ্ণতা পেছনে ফেলে দেখা দিত কুরবানির গোশত খাওয়ার উত্সাহ।’

মূলত বিশ শতকের শুরু থেকে সাহিত্য ও আত্মজীবনীতে কোরবানিবিষয়ক স্মৃতিচারণা লক্ষ করা যায়। কথাসাহিত্য আর স্মৃতিকথার পাশাপাশি সেকালের বাংলা কবিতায় কোরবানির সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কোরবানির ঈদ নিয়ে রচিত হয়েছে বেশ কিছু পদ্যও। ঈদ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলামই সবচেয়ে বেশি বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন তার কবিতা, গান ও গজল দিয়ে। ‘বকরীদ’ কবিতার শুরুতে তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, ‘শহীদানদের ঈদ এল বকরীদ।/অন্তরে চির নৌ-জোয়ান যে, তারি তরে এই ঈদ।/আল্লাহর রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কোরবান, /নির্লোভ নিরহঙ্কার যারা, যাহারা নিরভিমান, দানব-দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে, /ফিরদৌস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে ’।

তবে একালে হোক আর সেকালেই হোক, ঈদুল আজহার শিক্ষা চিরন্তন ও শাশ্বত। আড়ম্বরের প্রতিযোগিতায় যাতে কোরবানির ত্যাগ ও মাহাত্ম্য হারিয়ে না যায়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। তাই নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাশা হোক শোষণমুক্ত, ধনী-দরিদ্র বৈষম্যমুক্ত একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রযোজক, বিটিভি

 

ইত্তেফাক/ইআ