নির্বাচন কমিশনের কি কিছুই করিবার নাই?

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৩, ০৮:০৫

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বলিয়াছেন যে, জনগণ না চাহিলে তিনি ক্ষমতায় থাকিবেন না। একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি তিনি বারংবার পুনর্ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছেন; কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। সরকারদলীয় সমর্থক বলিয়া দাবিদার একশ্রেণির অতি উত্সাহী ও অনুপ্রবেশকারীর দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রীর উক্ত প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করিয়া নানা অপকর্মের মাধ্যমে এই সরকার ও সরকারপ্রধানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করিয়া চলিয়াছে। সরকারপ্রধানের জন্য আমাদের দুঃখ হয় এই জন্য যে, তাহাকে ছাড়া তাহার চারি পার্শ্বের সকলকে যেন পয়সা দিয়া কিনিয়া ফেলা যায়। ফলে তিনি অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত চিত্র পান না। যাহারা তাহার ও তাহার সরকারের বিঘোষিত মনোভাবের পরিপন্থি কাজ করিতেছেন, সেই সকল আত্মঘাতী, বহিরাগত ও স্বাধীনতাবিরোধীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকিবার জন্য বলা হইতেছে। ইহা ছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য নির্বাচন কমিশন চাহিলেই জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে; কিন্তু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা লইয়া আমরা স্বাভাবিক কারণেই সন্দিহান। এই ক্ষেত্রে তাহাদের কি কোনো দায়দায়িত্ব নাই?

প্রথমত, এবার সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন লইয়া নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা রহস্যজনক বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে। এই বিতর্ক শেষ না হইতেই সেইখানে একটি পৌরসভা ও একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যেই সকল তুলকালাম কাণ্ড একের পর এক ঘটিয়া যাইতেছে তাহাতে গণতন্ত্র ও শান্তিপ্রিয় মানুষ যারপরনাই আশাহত ও ব্যথিত। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর কীভাবে একটি পৌরসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নেতাকর্মীদের মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো মামলা দিয়া গ্রেফতার করা হয়? এই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কুম্ভকর্ণের ঘুম কি ভাঙিবে না? আবার সেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যাহা ঘটিয়াছে তাহা আরো দুঃখ ও ন্যক্কারজনক। গত ১৭ জুন ২০২৩ তারিখে কাউখালী উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের লইয়া এক মতবিনিময় সভায় একজন উঠতি ও সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারী নেতা কীভাবে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী পাঠিয়েছেন, এখানে আবার ইলেকশন কীসের?’ শুধু তাহাই নহে, তিনি নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে যিনি সাইকেল প্রতীক লইয়া নির্বাচন করিবেন, তাহার সাইকেল ভাঙিয়া-চুরিয়া পার্শ্ববর্তী কচা নদীতে ফেলিয়া দেওয়া হইবে বলিয়া হুমকি দিয়াছেন। এখানেই শেষ নহে। তিনি ‘এই মুহূর্তে নির্বাচনের জন্য কোনো কমিটি করার দরকার নাই, চমক আছে; যদি নির্বাচন করতেই হয়, তাহা হইলে দুরমুশ বাহিনী তৈরি করে নির্বাচন প্রতিহত করব’ এমন কথাও বলিয়াছেন প্রকাশ্যে। তাহার এই বক্তব্য যেমন পত্রপত্রিকায় ছাপা হইয়াছে, তেমনি অনলাইনসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনো ভাসিতেছে। এইরূপ বক্তব্য কি নির্বাচনি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও সরকার বিঘোষিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থি নহে? নির্বাচনে সহিংসতা, অরাজকতা, প্রতিবন্ধকতা ও নাশকতা সৃষ্টির পূর্ব আলামত নহে? এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কি কিছুই করিবার নাই? 

কাউখালীর উক্ত ঘটনার পর ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জীবননাশের আশঙ্কায় শিয়ালকাঠী ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী অসুস্থ হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হন। একই কারণে ঐ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র দাখিল করিতে পারেন নাই। উল্লেখ্য, এখানে নৌকার প্রার্থী একটি খুনের মামলার সাজাপ্রাপ্ত ও আরেকটি খুনের মামলায় জামিনপ্রাপ্ত আসামি। তাই এইখানে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের উপর বর্তায়। আমরা অবিলম্বে এই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের পুনঃতপশিল ঘোষণাপূর্বক সকল দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীকে অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানাই।

যাহারা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী তাহারা এই সরকারের কী পরিমাণ ক্ষতিসাধন করিতেছে তাহা সরকারপ্রধান ছাড়া আর কেহ উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন বলিয়া আমাদের মনে হয় না।  কেননা তাহারা ইহাকে তোয়াক্কা করিতেছেন না। যখন তাহাদের অপকর্মের কারণে বড় ধরনের অঘটন ঘটিয়া যাইবে, তখন যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো দেশের প্রধান নির্বাহীর স্কন্ধেই চাপিয়া বসিবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে দায়িত্বপালনকারী সুন্দরবন সাব-সেক্টরের কমান্ডার ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফফার ইতিমধ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যয়ন করিয়াছেন যে, ১৯৭১ সালে দুই জন রাজাকারের হস্তে ধরা পড়িয়া গণেশ চন্দ্র দেউরি (বিধান চন্দ্র) নিহত হন। সেই রাজাকারের বংশধরেরা এখন ক্ষমতাসীন দলের জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হইয়া উঠিয়াছেন। তাহারা দলে সুঁই হইয়া ঢুকিয়া যে ফাল হইয়া বাহির হইবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। নতুবা তাহাদের বক্তব্য ও কণ্ঠস্বর কীভাবে তাহাদের সহিত মিলিয়া যায়, যাহারা বলিয়া যাইতেছেন, বর্তমান সরকারপ্রধানের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নাই? তাহাদের কারণে সরকার দেশের ভিতরে ও বাহিরে সমালোচনার মুখে পড়িতেছে। অতএব, নির্বাচন কমিশন কেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারদলীয় লোক এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তাহাদের অর্থ-কড়িতে প্রভাবিত বিচার বিভাগের একশ্রেণির লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারিবে না? দুই লক্ষের বদলে কীভাবে একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৫০ কোটিরও অধিক অর্থ খরচ করিবার কথা বলা হইতেছে জনসম্মুখে? আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এই ক্ষেত্রে অভিভাবক হিসাবে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিবেন।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন