একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির দাবিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনা  

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৩, ১৯:২৬

সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট 'দ্য ফরগটেন জেনোসাইড: বাংলাদেশ ১৯৭১' শিরোনামে একটি ইভেন্টের আয়োজন করে। ৫২ বছর আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তার স্থানীয় সহযোগীদের দিয়ে যে নৃশংসতা ঘটিয়েছিল তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না এমন বার্তা দিতেই এই ইভেন্টের আয়োজন করা হয়।

রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক নিক পাওয়েল এর মতে, এটি বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ২ লক্ষ নারীর ধর্ষণ, ১ কোটি মানুষের ভিটেহারা হয়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আগমন এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের বাস্তু-চ্যুতি সারা বিশ্বের মানুষকে হতবাক করে দেয়। লন্ডনের সানডে টাইমস এ ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছে।

হেগ-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স ইউরোপীয় সংসদে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। এ সম্মেলনে সংস্থাটি এমইপি এবং বৃহত্তর গোষ্ঠীকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদানের সময় চলে এসেছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) ফুলভিও মার্তুসিলো এ উদ্যোগ নেন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আয়োজনের ব্যবস্থা করেন। তবে তার অনুপস্থিতিতে তার প্রতিনিধি কমিউনিকেশন এক্সপার্ট গিউলিয়ানা ফ্রাঙ্কোইসা তার হয়ে বক্তব্য দেন।

এমইপি ইসাবেলা অ্যাডিনোলফি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার সময় বাঙালি নারীরা যে বর্বরতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার ওপর আলোচনা করেন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কাছে এই গণহত্যার স্বীকৃতির আহ্বান জানান। 

গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্সের প্রেসিডেন্ট শ্রদ্ধানন্দ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইউরোপ যেকোন ধরনের গণহত্যা দমনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা থামাতে পারে নি। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলাভের পর, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ছিল, যেখানে উর্দু ছিল প্রধান ভাষা। অপরদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল অংশ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান ভাষা ছিল বাংলা। এক বছরের মধ্যেই উর্দুকে একমাত্র জাতীয় ভাষা ঘোষণার চেষ্টা করা হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী সংসদীয় আসনের দুটি ছাড়া সবকটিতে জয়লাভ করে এবং সমগ্র রাজ্যের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

তাকে সরকার গঠনের অনুমতি না দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের গ্রেফতার ও হত্যা করার জন্য "অপারেশন সার্চলাইট" এর পরিকল্পনা করে। এটি ছিল গণহত্যার পথে তাদের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়৷ পরেরদিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সম্মেলনে দেখানো একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন প্রত্যক্ষদর্শী তার বাবাকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেন পাকিস্তানিদের হাতে। বাবার লাশ খুঁজতে খুঁজতে গিয়র তিনি আরও চার ব্যক্তির লাশ খুঁজে পান।

ইউরোপীয় ইউনিয়নকে উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি, মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, সারাবিশ্বের জন্য মানবাধিকারের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ এর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশের গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদান করে তবে তা অনেক বড় পদক্ষেপ হবে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের নয় মাসে কী ঘটেছিল তা বিশ্বকে জানানোর দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশিদের। বাংলাদেশিরা এই স্বীকৃতির জন্য এত বছর ধরে অপেক্ষা করেছে, প্রয়োজনে আরো করবে। তবে এ উদ্যোগের ব্যাপারে বাংলাদেশিরা এখনও সাহস হারায়নি।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি এবং সেইসাথে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচারণা জোরদার করার ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এমইপি এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মানেল সালমি। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতির গুরুত্বের উপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে বেলজিয়ামের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন জাতীয়তার মানুষ উপস্থিত ছিলেন

.