তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির তিক্ত চেহারা

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩, ০৬:৩০

উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রায়শই বলা হইয়া থাকে, এইখানে রাজনীতি করা কঠিন। ইহার কারণ হিসাবে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশে সরকার পরিচালনা করিতে যাওয়ার অর্থই হইল উত্তপ্ত কড়াইয়ের উপর নিজেকে সমর্পণ করা! তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাসীন নেতাদের চরম ও করুণ অবস্থা সঙ্গে করিয়া বিদায় লইবার দৃশ্যই অধিক দৃষ্টিগোচর হয়—ইহাও যেন ধরাবাঁধা নিয়ম! পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরিণতি কি ইহার জলজ্যান্ত উদাহরণ নহে? মাটিকাঁপানো এই নেতাকে কেন্দ্র করিয়া একের পর এক যেই সকল ঘটনা ঘটিতে দেখা যাইতেছে, তাহাতে কি কাহারও মনে হইতে পারে, ক্ষমতায় থাকিতে সেনা সদর দপ্তর অবধি দাপাইয়া বেড়াইয়াছেন তিনি! যাহার অবাধ বিচরণ ছিল সর্বময়, ক্ষমতা যাইতে না যাইতেই সেই প্রতাপশালী নেতার বিরুদ্ধে রাতারাতি শত শত মোকদ্দমার স্তূপ জমিয়া উঠিয়াছে! প্রচলিত একটি রাজনৈতিক প্রবাদের সারকথা অনেকটা এই রকম, ‘উন্নয়নশীল দেশ পরিচালনা করিতে যাওয়ার অর্থই হইল কলঙ্কের কালিমা গায়ের উপরে আসিয়া পড়িবার জন্য অপেক্ষা করা—হোক তাহা সত্য অথবা মিথ্যা।’ ইহাকে ‘নিয়তির লিখন’ বলিলেও ভুল বলা হইবে না। কেননা এই সকল ক্ষেত্রে যে পিছন হইতে শক্ত হাতে কলকাঠি নাড়িয়া থাকেন কেহ না কেহ, ইহা আজিকার দিনে স্বল্পবুদ্ধির ব্যক্তির বুঝিতে পারার কথা। ক্ষমতার পালাবদল মানেই বিদায়ি নেতাকে অন্তরিন করিয়া রাখিতে হইবে, বিরোধীদলের লোকজনকে জেলে পুরিয়া দিতে হইবে—উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনীতির সুষ্ঠু চর্চার পথে বড় বাধা এই অপসংস্কৃতি।

ইমরান খানের অভিযোগ, সকলে মিলিয়া তাহার রাজনৈতিক দল পিটিআইকে তো ‘বন্দি’ করিয়াছেই, উপরন্তু প্রাণনাশের হুমকিতে রহিয়াছেন তিনি। ইমরানের আক্ষেপ, পৃথিবীর কোনো দেশে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাত্র মাস ছয়েকের ব্যবধানে ১৮০টি মামলা দেওয়ার নজির নাই! উন্নত বিশ্বে কি এমন সংস্কৃতির চর্চা হইতে দেখা যায়? মোটেও নহে। দুঃখজনকভাবে এই চিত্রের অবতারণা ঘটে কেবল তৃতীয় বিশ্বের মাটিতে। উন্নয়নশীল বিশ্বের তুলনামূলক ক্ষুদ্র কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর উপর দমনপীড়ন ও জেল-জুলুমের স্টিমরোলার চালানো তো হয়ই, বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীকে ‘ভিতরে’ না রাখিয়া যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যায় না! সিংহাসন ছাড়িলেই অবধারিতভাবে যদি অন্ধকার প্রকোষ্ঠের স্বাদ ভোগ করিতে হয়, তাহা হইলে তো কোনো ক্ষমতাসীন দলই অতি সহজে ক্ষমতা ছাড়িতে চাহিবে না। সমস্যা মূলত এইখানেই। কিন্তু প্রশ্ন হইল, ইহার সমাধান কী? এই প্রবণতা দূর হইবে কী প্রকারে? বিরোধী দলের নেতাকর্মীর উপর ক্ষমতাসীন দলের পাতি নেতাকর্মীকে পর্যন্ত যেইভাবে তাড়িয়া আসিতে দেখা যায়, গলাবাজি করিতে দেখা যায়, তাহাতে স্পষ্ট—তাহাদের পিছনে বসিয়া কলকাঠি নাড়িতেছে অন্য কেহ। এই ‘অন্য কেহ’-এর দলে প্রশাসনের অসাধু লোকজনই শুধু থাকেন না, ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশকারী এবং নামধারী ও সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকে খেলার কলকাঠি। এমনকি তাহাদের সহিত আইন বিভাগও তাল মিলাইয়া চলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ইহার চূড়ান্ত পরিণতি কী হইতে পারে, কতিপয় উন্নয়নশীল সরকারের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেই উত্তর পাওয়া যাইবে। এইরূপ প্রসঙ্গে সকল সময়েই একই বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়—সরকারের নাম ভাঙাইয়া অন্যায়, অপরাধ, অপকর্ম করে হাইব্রিড তথা দলে অনুপ্রবেশ করা লোকজন। এবং এই সকলের দায় শেষ পর্যন্ত গিয়া পড়ে দলটির এক নম্বর ব্যক্তির উপর। অথচ তিনি হয়তো আন্দাজও করিতে পারিবেন না যে, দলে বাহিরের লোক ঢুকিয়া কী অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে! এই অবস্থায়, দলের দুষ্কৃতকারীদের অপকর্মের বোঝা মাথায় লইয়া যখন ক্ষমতার বাহিরে ছিটকাইয়া পড়েন সরকারপ্রধান, তখন তাহার সঙ্গেও ঘটে ‘অনুরূপ কিছু’। অর্থাৎ, বিরোধী দল হিসাবে ক্ষমতাসীন কিংবা বড় দলগুলির হামলা-মামলায় নাস্তানাবুদ হইয়া চক্কর কাটিতে হয়!

বাস্তব সত্য হইল, কতিপয় উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে হাঁটি হাঁটি পা পা করিয়া এমন ‘পলিটিক্যাল সিস্টেম’ গড়িয়া উঠিয়াছে, একটি সময়ে আসিয়া ‘সিস্টেমে পড়িয়া’ নাস্তানাবুদ হইতে দেখা যায় খোদ সেই দলের নেতাকর্মীকেই। ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়া যাহারা রাজনৈতিক পরিবেশ বিনষ্ট করিয়াছে; ছোট দলের নেতাকর্মীর উপর দমনপীড়ন চালাইয়াছে, তাহারাই একটি সময়ে আসিয়া খবরের শিরোনাম হইয়া উঠে। ইহাই তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির অবধারিত তিক্ত চেহারা!

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন