নতুন আয়কর আইন কি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সক্ষম হবে?

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩, ০৭:১০

বাংলাদেশের রাজস্বনীতি এবং মুদ্রানীতি নিয়ে দাতা সংস্থাগুলো অনেক বছর ধরে সমালোচনা করে আসছে। সমালোচনা থাকলেও এই দুই নীতি সংস্কারের জন্য কোনো ক্ষমতাসীন সরকার প্রয়োজন মনে করে নাই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যখন ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করল তখন কিছু শর্ত জুড়ে দিল। রাজস্বনীতি এবং মুদ্রানীতি সংস্কার করা ছাড়া  আইএমএফের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই ঋণ অনুমোদন করবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ঋণ খুবই প্রয়োজন ছিল। ঘাটতি বাজেট পূরণে এই ঋণ সহায়ক হবে। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধিতে এই ঋণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই, আইএমএফের শর্ত পূরণ করা বাঞ্ছনীয়। শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে অবশিষ্ট কিস্তি বন্ধ হয়ে যাবে। মোট সাত কিস্তির মধ্যে প্রথম কিস্তি পাওয়া গেছে। আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৩-এর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে আইএমএফের কিছু শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে। মনে করি, এই শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর।

বাংলাদেশের রাজস্বনীতি নিয়েও অনেক সমালোচনা আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিম যুগের রাজস্বনীতি নিয়ে কোনোভাবেই অর্থনীতিকে সামনে টেনে নেওয়া যাবে না। এই নীতি এখন আধুনিকীকরণ করতে হবে। আধুনিকীকরণ করতে না পারলে রাজস্ব আয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। কর-জিডিপি অনুপাত কমতে থাকবে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে সৃষ্টি হবে বহু সমস্যার। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য দরকার করকাঠামো আধুনিকীকরণ করা। কর-জিডিপি অনুপাতের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। এমনকি সারা বিশ্বের মধ্যে রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২১-এর তথ্যে অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত রেকর্ড করা হয়েছিল গড়ে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ সেখানে ভারতে ছিল ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, নেপালে ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ছিল ১২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০২১-এর আউটলুক অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ২৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং উন্নত দেশে ছিল ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ঢাকাভিত্তিক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে কর জিডিপি অনুপাত হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ, এক বছর আগে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত হারে না থাকায় প্রতি অর্থবছরে ব্যাপক আকারে বাজেট ঘাটতি দেখা যায়। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক-ব্যবস্থা এবং বিদেশি উত্স থেকে ঋণ নিতে হয়। এ ঋণের প্রভাব দেখা যায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। আবার, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ধার নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এর ফলে মানুষের কর্মসংস্থান কমে যায়। বেকারত্ব বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। আসলে একটা অর্থনীতিতে রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর থেকে রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এ কারণে বিদেশি উত্স থেকে ঋণ নিয়ে অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সঠিক সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এজন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া অর্থনৈতিক সুফল আশা করা ভুল হবে।

এবার আইএমএফের শর্তের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে আয়কর আইন ২০২৩ পাশ হলো। নতুন আয়কর আইন মূলত আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-কে আংশিক সংস্কার করে করা হয়েছে। নতুন আয়কর আইনে ২৫টি অধ্যায়, ৩৪৫টি ধারা এবং আটটি তপশিল আছে। এবার নতুন আয়কর আইনটি বাংলা ভাষায় প্রণীত হয়েছে। কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) যাদের আছে, তাদের ওপর সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকার কর দেওয়ার বিধান বাতিল করে আয়কর আইনটি সংসদে পাশ হলো। আইএমএফের শর্তানুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। পরবর্তী অর্থবছর অর্থাত্ ২০২৬-এ অনুপাত বাড়াতে হবে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। এ শর্ত পূরণ করতে না পারলে অবশিষ্ট ঋণের কিস্তি না পওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দুঃখের বিষয় যে, এ অনুপাত দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। বিগত কয়েক বছর ধরে কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রবণতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ঢাকাভিত্তিক পিআরআই-এর গবেষণাপত্র বলেছে যে, কর অব্যাহতি মোট জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ খেয়ে ফেলছে। এ থেকে বলা যায় যে, এই মুহূর্তে কর অব্যাহতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। পিআরআইয়ের গবেষণার তথ্যমতে, ২০১১ থেকে ২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত কর-রাজস্ব বৃদ্ধির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক শূন্য শতাংশ। দুঃখজনক যে, ২০১১-এর অর্থবছরের তুলনায় ২০২২ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে গেছে। এখন আইএমএফের শর্ত পালন করতে হলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কি সম্ভব? বিগত বছরের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে বলা যায় যে, আইএমএফের শর্ত রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। রাতারাতি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য নতুন আয়কর আইনের পক্ষে কি সম্ভব? উত্তর হলো সম্ভব নয়। তাহলে এখন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর উপায় কি? এর সমাধান খুবই সহজ। করের জাল বিস্তার করতে না পারলে শুধু আইন প্রণয়ন করে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো যাবে না। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন আইন সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর আছে ৮৬ লাখ। এর মধ্যে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ রিটার্ন জমা দেয় না। টিআইএন ধারকদের ৯০ শতাংশ রিটার্ন জমা দিলেও রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যদিও নতুন আয়কর আইন এটিআইএন বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে নানা কারণে। এর প্রভাব তেমন পড়বে না। আয়কর অধ্যাদেশে ৩৮টি সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে হলে রিটার্ন জমার প্রমাণ দাখিল করতে হতো। নতুন আয়কর আইনে ৩৮টি সেবার সঙ্গে আরো পাঁচটি নতুন খাত যোগ করা হয়েছে। নতুন আয়কর আইন কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসা অর্জন করেছে। যেমন :কোনো করদাতা দেশের বাইরে সম্পদ ক্রয় করলে তাকে সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়া, কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাক্ষমতা কমানোর বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে নতুন আয়কর আইনে। নতুন আয়কর আইন অনেকটা মানবিক হয়েছে। কোনো করদাতা যদি মারা যায় বা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বা পরপর তিন বছর করযোগ্য আয় না থাকলে টিআইএন বাতিল করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ বিষয়গুলো অনেকটা ইতিবাচক।

আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই মুহূর্তে ভ্যাট আইন, ২০১২ বাস্তবায়ন করা অতি প্রয়োজন। বলা প্রয়োজন যে, মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে, যা পরোক্ষ কর হিসেবে পরিচিত। গবেষণা সংস্থার মতে ভ্যাট আইন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত হওয়া উচিত ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। এখন আছে ৮ শতাংশের মধ্যে। দুর্বল দিক হলো যে, রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের অবদান অনেক বেশি। মোট রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান ৩৫ শতাংশ এবং পরোক্ষ করের অবদান ৬৫ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে প্রত্যক্ষ করের অবদান সবচেয়ে বেশি। নতুন আয়কর আইন নাকি প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে সহায়ক হবে?  এটা দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে না পারলে কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না।

স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ হওয়ার স্বপ্ন আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। কর-জিডিপি অনুপাত ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে না পারলে উন্নত বাংলাদেশ হওয়ার স্বপ্ন শুধুই স্বপ্নই থেকে যাবে। নতুন কর আইনে কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়নি। যেটা প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন গিনি সহগ ০.৪৯৯। গিনি সহগ হলো অর্থনীতিতে আয়-বৈষম্য পরিমাপক। গিনি সহগ যখন ০.৫০০ হবে, তখন উচ্চ আয়-বৈষম্যের অর্থনীতি বলে গণ্য করা হয়। সুতরাং অচিরেই বাংলাদেশ একটি উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশ হতে চলেছে। রাজস্বনীতির মাধ্যমে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব। বৈষম্য কমানোর বিষয়ে নতুন আয়কর আইন কি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ? যদি না হয় তাহলে অর্থনীতিতে সামগ্রিক কল্যাণ কীভাবে দেখা যাবে? কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে যদি আয়কর আইন সংস্কার করার প্রয়োজন হয়, সামনের দিনে আরো সংস্কার করতে হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এমএএম