উন্নয়নশীল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অরণ্যে রোদন!

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৩, ০৫:২৯

উন্নয়নশীল দেশে কিছুই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নহে। তাহাতে এই সকল দেশের বুদ্ধিজীবীরা যতই ভালো ভালো কথা বলুন বা লিখুন না কেন। এই সকল দেশে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আইন-আদালত পর্যন্ত যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হইয়া পড়ে, তাহাদের সমন্বিত গ্রুপ বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়, তাহা হইলে নির্বাচনসহ সকল কিছু কীভাবে সুষ্ঠু হইবে? সহজে ও স্বাভাবিক নিয়মে কোনো কাজই তো এইখানে হয় না। ইহা দেখিয়া আমাদের মনে হয়—এই সকল দেশের সমাজটা যেন পচিয়া গিয়াছে। এই সকল দেশে ক্ষমতাসীনরা যাহা করেন, তাহাতে ইউরোপীয়সহ যে কোনো উন্নত দেশ হইতে যে কেহ আসুন না কেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করা বৃথা। এই সকল দেশের মানুষের শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনৈতিক দৈন্য দশার কারণে নির্বাচনকে কালো টাকা ও পেশিশক্তি দ্বারা প্রভাবিত করা কঠিন কিছু নহে। এই জন্য যাহারা এই সকল দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও আইনের শাসনের কথা বলেন, তাহাদের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত নূতন নূতন গ্রহে চলিয়া যাওয়া উচিত বলিয়া অনেকে মনে করেন।

এই সকল উন্নয়নশীল ও সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে সকলেই যে কোনো প্রকারে ক্যাপিটাল বা মূলধন তৈরিতে ব্যস্ত। স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতাব্দীকাল অতিক্রম করিলেও এখনো তাহাদের মূলধন গঠনের কাজ শেষ হইতেছে না। এই জন্য এই সকল দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও লুটপাটতন্ত্র ঢুকিয়া পড়িয়াছে। লেখক-সাহিত্যিকগণ কী সুন্দরভাবে বলিয়াছেন যে, যে কোনো কিছুর পচন শুরু হয় মাথা হইতে। এখন এই পচন এই সকল দেশের সমাজদেহের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা’। যাহারা এই সকল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পরামর্শ দিতে আসেন, তাহারা যে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বেওয়াকিফহাল, তাহা বলিবার দুঃসাহস নাই আমাদের। তবে তাহারা কীজন্য এবং কোন মতলবে আসেন, তাহা সচেতন মহলের অজানা নহে। তাহাদের দৌড়ঝাঁপ ও প্রচেষ্টা যে শেষ পর্যন্ত কাঁঠালের আমসত্ত্ব রূপ ধারণ করিবে না বা অশ্বডিম্ব প্রসব করিবে না—তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না।

উন্নয়নশীল দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যাহারা থাকেন তাহাদের নৈতিক অবস্থান বলিতে গেলে দুর্বল। রিটার্নিং, প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার এবং কর্তব্যরত পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে উপরি দিয়া ক্রয় করিয়া লওয়া কোনো কঠিন কাজ নহে। এই উপরি বা ঘুষ মহা অপরাধ, ইহা দেশ ও জাতির জন্য সর্বনাশের কারণ—এমন নীতিকথার কোনো মূল্য নাই তাহাদের নিকট। বরং দুর্নীতির সুবিধা হইল যে কোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত ক্রয় করিয়া লওয়া যায়। সিদ্ধান্ত নিলামে তোলা যায়। বাংলায় আরেকটি প্রবাদ আছে, ‘টাকা দিলে বাঘের চোখও মেলে’। ফলে এই সকল দেশে নির্বাচন হইল বাড়তি আয়ের মহোত্সব। কথায় বলে—চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। তাই যাহারা অপকর্ম করে তাহাদের উন্নত দেশের সবক দিয়া কোনো লাভ নাই। বরং যেই দেশে যেই নিয়ম সেই অনুযায়ী চলাই কি শ্রেয় নহে? এই সকল দেশের প্রধান নির্বাহী না চাহিলেও অনেক সময় মাঠপ্রশাসনকে ক্রয় করিয়া ফেলা যায়। আর মাঠে-ময়দানে যাহারা থাকেন, তাহাদের ভূমিকাই তো মুখ্য। এই জন্য এই সকল দেশে যাহারা নির্বাচন বয়কটের পক্ষপাতী, তাহাদের রাজনীতিতে আসিবার কী দরকার? সকলকে রাজনীতি করিতেই হইবে, এমন তো কোনো কথা নাই!

বস্তুত উন্নয়নশীল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশই নাই। যাহারা এই পরিবেশের সহিত খাপ খাওয়াইতে পারিবেন না, তাহাদের উদ্দেশে বলিতে চাই, আপনারা নির্বাচনে আসিবেন না। আপনাদের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হউক না কেন, আপনারা এই সকল দেশের মাটির খবর রাখেন না। এই সকল দেশের নির্বাচন কমিশন যদিও কসম কাটিয়া বলেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হইবে, তাহা হইলেও তাহা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে অন্যায়-অপকর্ম করিয়া যাহারা নির্বাচনি বৈতরণি পার হন, ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, এতকিছু করিবার পরও তাহাদের শেষ রক্ষা হয় না। বর্তমানে পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত—সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব। এই দুই বিশ্বই মহাসমস্যায় রহিয়াছে। এমতাবস্থায় যে পর্যন্ত জনগণ ও ভোটাররা ভোটের মর্যাদা না বুঝিবেন, শিক্ষদীক্ষা ও অর্থে উন্নত না হইবেন, কীসে এলাকার ভালো হইবে তাহা না বুঝিবেন, ততদিন পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশে একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কামনাপূর্বক অরণ্যে রোদন করিয়া কী লাভ? যাহারা বিদেশ হইতে আসেন এবং মনে করেন তাহাদের দেশের মতো ভোট হইবে, তাহারা সেই সকল দেশের যেই সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচন হইতেছে, সেখানে যান না কেন?

 

ইত্তেফাক/ইআ