চয়ন

আমার কথা

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯, ১৯:৩৮

কাগজ বের করার নেশা। কিন্তু পুঁজি নেই। রূপছায়া কি ঝংকারের মতোই। কিন্তু চাঁদা তোলার বয়েস নয় সেটা। কাজেই স্ত্রীর গহনা দিয়েই যাত্রা শুরু হলো। গহনার একটা গতি যাতে হয় সে ব্যাপারে সাহায্য করল মাহমুদুল হক, যাকে আমরা সকলে বটু বলেই জানি। বটু আমার শুধু সখাই নয়, প্রাণসখা। এ ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি। বলেছিল—পঞ্চাশের এ পারে এসে অ্যাডভেঞ্চার মানায় না। মন যদিবা পারে, দেহ আর ভার বইতে পারবে না। ক্ষান্ত হোন। ভাবির গহনা বলে কথা।

বটু যা বলেছিল তার বাড়া সত্যি নেই। কিন্তু চিরকেলে জেদটারই জয় হলো। কিন্তু পত্রিকার নাম খুঁজতে গিয়ে যখন নয়পীঠীর ঘরে আনাড়ির মতো চালাচালি করছি, তখন হঠাত্ প্রেমেন্দ্র মিত্র ও রমাপদ চৌধুরীর যুগল মূর্তি চোখে উদয় হলো :

পঞ্চাশের মাঝামাঝি কোনো সময়। ‘রূপছায়া’-র কাজে তখন কলকাতায়। অনুজপ্রতিম ধীরাজ ভট্টাচার্যের সঙ্গে গিয়েছি প্রেমেনদার হরিশ মুখুজ্জে স্ট্রিটের আড্ডায়। আড্ডা তখন তুঙ্গে। ধীরাজদা, অভিনেত্রী রেণুকাবালা এবং প্রকাশক ও ভক্তের দল চা খাচ্ছেন আর গল্পের ভুশুড়ি ভাঙছেন। এমন সময় দরজায় দেখা দিলেন এক যুবক নমস্কারের ভঙ্গিতে। প্রেমেনদা বললেন—কী খবর, এত সাতসকালে?

আগন্তুক জানালেন একটা পত্রিকা করতে যাচ্ছেন, তাঁর আশীর্বাদ চাই।

ভেবেচিন্তে নাবছ তো—দেখছি তো ৩/৪ সংখ্যার বেশি টেকে না কোনো কাগজ।

—না, প্রমেনদা বুঝেশুনেই, নাবছি। ভালো লোক পেয়েছি।

—তো কী নাম দিলে?

—আজ্ঞে এখানেই যত গেরো—‘রমাপদ চৌধুরীর পত্রিকা’।

—না হে, ঠিক হলো না। নামটার মধ্যে একটা আত্মম্ভরী ভাব রয়েছে। নামটা বদলাও হে।

কিন্তু রমাপদ চৌধুরী নড়েননি। ধীরাজদা ও আমার কিন্তু নামটা ভালোই লেগেছিল।

সেই ভালো লাগাটা এতদিন পরে নিজের কাজে লাগাই নে কেন। তখন ভেবেছিলাম রমাপদ খুব একটা নতুন চাল চেয়েছিলেন। পরে পত্রিকা জগত্ নাড়াচাড়া করে দেখলাম পৃথিবীর বহু দেশে নিজের নামে পত্রিকার চল বহু আগে থেকেই আছে। আর আমাদের এই ভূভাগে ১৭৮০ খৃ. যে প্রথম সংবাদপত্র বেরোয় তার নাম তো মালিক সম্পাদকের নামেই—‘হিকি‘স্ বেঙ্গল গেজেট অব দি অরিজিনাল ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইজার’।

জন্ম নিল ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’। যথাবিধি প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতোই অনেকের কানে পত্রিকার নামটা আত্মগরিমার মতো শোনাল। পরে অবশ্য প্রায় সবাই সন্তুষ্ট চিত্তেই মেনে নিয়েছেন। এই যেমন কবি আবুল হোসেন পত্রিকার নামকরণ প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি  নে;

‘বেশ কয়েক বছর আগে জনাব মীজানুর রহমান তাঁর পত্রিকায় ক’টি নতুন-পুরনো সংখ্যা উপহার দিয়ে একটা লেখার জন্য যখন অনুরোধ জানিয়েছিলেন তখন পত্রিকাটির প্রচ্ছদের ওপর এক নজর চোখ বুলিয়েই অবাক হয়েছিলাম। এ দেশে সম্পাদকের এই ধরনের দুঃসাহস আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। নিজের নামে পত্রিকার নাম রাখা খুব সাধারণ ঘটনা নয়। ...পরে বিভিন্ন সংখ্যা পড়ে নিশ্চিত হয়েছি যে শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়, সর্বার্থেই পত্রিকাটি তাঁর। এর পরিকল্পনা ও রূপায়নে তাঁর হাতের ছাপ সুস্পষ্ট। সম্পাদকীয় লেখার ধরনেই তাঁর নিজস্বতা চোখে পড়ে। ...’        (অংশবিশেষ)

 

সূত্র : মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা-র মীজানুর রহমান সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি ২০০৭-মার্চ ২০০৮)