অর্থনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বাজারে নির্ধারিত হয় সাধারণত পণ্যটির চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। বাজার পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভোক্তা, উত্পাদনকারী ও বিতরক (ব্যবসায়ী)—এই তিন বাজার কুশীলব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হলে দাম কমবে এবং চাহিদার তুলনায় জোগান বা সরবরাহ কম হলে তার বিপরীত ঘটবে। ‘পণ্যের দাম’ বাজারের জোগান চাহিদা পরিস্থিতির অন্যতম সংকেত হিসেবে কাজ করে।
বাজারের এই জোগান ও চাহিদার মাধ্যমে যে সম্পর্ক, তা সীমিত সম্পদের বণ্টন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজার অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া বাজারের এই ক্রয়বিক্রয় প্রক্রিয়া অদৃশ্য হাত দ্বারা পরিচালিত হয়। অদৃশ্য হাত (মুনাফা অর্জন প্রবৃত্তি) বলতে বাজারের সেই অপর্যবেক্ষণযোগ্য শক্তিকে বোঝানো হয়, যার ফলে পণ্যের চাহিদা ও জোগান স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘দাম ভারসাম্যের’ দিকে এগিয়ে যায়। তবে মুক্ত বাজারব্যবস্থার সুবিধা ও অসুবিধা উভয়ই রয়েছে। সুবিধার মধ্যে রয়েছে—এই পদ্ধতির ফলে বাজারের সম্পদের ব্যবহার বণ্টন সবচেয়ে কার্যকরভাবে হয় এবং বাজারের সংকেত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবেন, সে বিষয়ে বার্তা পান। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সমগ্র প্রক্রিয়াটি সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত। উত্পাদনকারীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো উত্পাদন এবং ভোক্তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ক্রয় করতে পারবে। মুক্ত বাজারব্যবস্থায় সর্বোচ্চ উত্পাদন অর্জিত হয়। মুক্তবাজারের অসুবিধা হলো, এর ফলে বাজারে ব্যর্থতা সৃষ্টি হতে পারে, বিশেষ করে যেসব সামাজিক উপযোগিতা সেবা বা পণ্য লাভজনক নয়, সেই সব সেবা বা পণ্য সরবরাহ বা উত্পাদন না-ও হতে পারে। তাছাড়া বাজারব্যবস্থায় বড় করপোরেশন বা কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসা ও অলিগলি যখন কতিপয় বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তারা অধিক মূল্য আদায়ে সচেষ্ট থাকে, যা মুক্তবাজারের ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত।
পৃথিবীর কোনো দেশে একেবারে পুরোপুরি ‘মুক্তবাজার’ বা ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত’ অর্থনীতি নেই। তবে নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। কোনো অর্থনৈতিক মতাদর্শ পরমভাবে সব সময়ের জন্য সত্য নয়। একেক সময় একেক মতাদর্শ আধিপত্য বিস্তার করে। তবে ‘সংরক্ষণবাদ’ বনাম ‘উদারবাদ’—এ দুই অর্থনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্ব বোধহয় অনেক দিন পর্যন্ত টিকে থাকবে। বাজার অর্থনীতির বর্তমান যুগেও মাঝে মাঝে বাজারে শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটে, অর্থনৈতিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘বাজার ব্যর্থতা’। ‘বাজার ব্যর্থতা’ বলতে বাজার অর্থনীতির পণ্য ও সেবার অকার্যকর বণ্টনকে বোঝানো হয়। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে, তবে আমাদের দেশে এর মূল কারণ হলো দুটি—প্রথমটি হলো ব্যবসায়ী কিংবা সরকার কর্তৃক ‘বাজারের নিয়ন্ত্রণ’ চেষ্টা; দ্বিতীয়টি হলো ‘তথ্যের ঘাটতি’। আমাদের দেশে রমজানের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এটা অনেকটা ব্যবসায়ীদের কারসাজি। এর জন্য ব্যবসায়ীরা উত্পাদনে ঘাটতি, উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ইদানীংকালের আমদানি খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করেন। সরকারও খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্য নিত্য পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে।
বাজারে উত্পাদক বা সরবরাহকারীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি ভোক্তারও সমান অধিকার রয়েছে, যদি ব্যবসায়ীরা অনেক সংঘবদ্ধ ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার থাকেন। দ্বিতীয়ত, বাজারব্যবস্থায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে পণ্যের উত্পাদন বা আমদানির সম্পূর্ণ তথ্য যথাসময়ে পাওয়া না গেলে চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে যায়। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে (উত্পাদনে ঘাটতি থাকলে) নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই যেমন গত জুন মাসে পেঁয়াজের দাম বেড়ে কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আবার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হবে ঘোষণায় পেঁয়াজের দাম দ্রুত কমে যায়। পেঁয়াজের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকার গত ১৫ মার্চ পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করে। কোভিডের ধকল কাটিয়ে ওঠার পর ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত ও জ্বালানি তেলের সরবরাহজনিত সমস্যার কারণে ২০২২ সালের শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার খাদ্যদ্রব্য আমদানি হ্রাস ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই সঙ্গে কৃষকেরা যাতে ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সেজন্য আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই ঈদের আগে পেঁয়াজের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে আমরা যেমন দেখেছি, চলতি জুলাই মাসে আমরা মরিচের ক্ষেত্রে একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। মরিচের দাম দু-এক জায়গায় কেজি প্রতি ১২০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। ইতিমধ্যে হঠাত্ অতিবৃষ্টিতে কাঁচা মরিচের গাছগুলো খেতে পঁচে যায়। এখানে সিন্ডিকেশন নয়, মূল সমস্যা ছিল উত্পাদনে ঘাটতি। এই ঘাটতি যথাসময়ে প্রচারিত হয়নি, যাতে দ্রুত আমদানির পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আবার ভারত থেকে আমদানির খবরে দ্রুত দাম পড়ে যায়। এতে ভোক্তা ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলে।
প্রকৃতপক্ষে বাজারে চাহিদা ও উত্পাদনের নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ বিষয়ে সরকার উভয় সংকটে পড়ে। একদিকে বেশি আমদানি করতে দিলে ‘কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত’ হন, কারণ দাম কমে যায়। ফলে কৃষকেরা পরবর্তী সময়ে তা উত্পাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে আমদানি করতে না দিলে দাম বেড়ে যায়, আর ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেজন্য বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি ভূমিকার গুরুত্ব আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং ভোক্তা ও উত্পাদক এই দুইয়ের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে যদি সরকারি যেসব সংস্থা বাজার পরিবীক্ষণ ও তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জোগান তথ্য সংগ্রহ করে তা নীতিনির্ধারকদের সামনে সময়মতো তুলে ধরতে পারে। তাছাড়া আমাদের দেশে আবহাওয়াও অনুকূলে নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন আর ষড়্ঋতু সঠিকভাবে সঠিক সময়ে আসছে না। আবার কোনো কোনো সময় প্রচণ্ড গরম আর বৃষ্টির অভাব অথবা হঠাত্ প্রচুর বৃষ্টির কারণে কৃষকদের সঠিক সময়ে ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরবরাহ হঠাত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ যেমন দরকার, তেমনি উন্নত দেশের মতো ‘প্লাস্টিক হাউজ’ কৃষি পদ্ধতির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের চেয়ে ৩ দশমিক ৬ গুণ ছোট। অথচ নেদারল্যান্ডস ২০২২ সালে শুধু কৃষিপণ্য রপ্তানি করেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরোর মতো, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির চেয়ে বেশি। অথচ বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের মোট রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি (২০২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ১.১৬ বিলিয়ন ডলার)। সুতরাং কৃষিপণ্য এমনভাবে উত্পাদন করতে হবে, যাতে প্রকৃতির ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে না হয়। এর জন্য দরকার কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন, বিশেষ করে কৃষির আধুনিকায়নে সরকারকে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে আগামী দিনগুলোতে। তবে সেটা বেশ সময় সাপেক্ষ। তার আগে কতগুলো পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন—কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে একটা পণ্য আসতে যে খরচ, তার ব্যবধান কমাতে হবে। যেমন—যশোরে কৃষক পর্যায়ে পাইকারি প্রতি কেজি মরিচের দাম যদি ৫০ টাকা হয় এবং ঢাকায় তার দাম যদি তিন-চারগুণ হয়, তাহলে বোঝা যাবে পরিবহন বাবদ চাঁদাবাজি (বাজার ব্যর্থতা) বাবদ যে খরচ, তা কমানোর সুযোগ রয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়, তা কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খুচরা পর্যায়ে দোকানে দোকানে তদারকির চাইতে পাইকারি বাজারে তদারকি জোরদার কতে হবে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের স্বার্থে আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক উচ্চপর্যায়ের কমিটি থাকতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাজারে প্রতিযোগিতার (মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রাণশক্তি) পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। বাজারকে বাজারের মতো চলতে দিতে হবে, বেশি চেপে ধরা যাবে না। আবার বাজার ব্যর্থতা এড়াতে একেবারে বাজারের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যাবে না, অর্থাত্ এটি হলো বাস্তববাদ বা প্রয়োগবাদ; সংরক্ষণবাদও নয় আবার বিশুদ্ধ উন্মুক্ত মুক্তবাজারও নয়। বাজারের নিয়ন্ত্রণ যাতে কতিপয় আমদানিকারকের মতো বড় খেলোয়াড়দের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, যাতে তারা নিজেদের সুবিধামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল যাতে কোনোক্রমে বাধাগ্রস্ত না হয় বা ভেঙে না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ঘাটতি পণ্যের আমদানি যতটা সম্ভব মুক্ত রাখতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কর কমানো বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মওকুফ করে দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে নিম্ন আয়ের লোকজনের জন্য বাজারে ওএমএসের কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বিভিন্ন পণ্যের দামের ওঠানামার মাসভিত্তিক গড় ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তা পণ্যের মাসিক মূল্য প্রক্ষেপণের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।
খাদ্যের গুণগত মানের ব্যাপারে আমাদের দেশের মানুষের যে ধারণা, তা বদলানোর চেষ্টা করতে হবে। খামারি বা প্রান্তিক পর্যায়ে যা উত্পাদন হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করার পর সেই খাদ্যপণ্যের ওপর গুণগত মান রাখার ব্যাপারে বিশেষ করে ভোক্তা পর্যায়ে কার্যকর চাহিদা তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। খাদ্যে ভাজাল রোধে (বাজার ব্যর্থতা) আরো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন বাজারে যে দুধ বা ফলের জুস পাওয়া যায়, সেগুলোর মানের ব্যাপারে মানুষ যথেষ্ট সন্দিহান। ফলে সেগুলোর বড় ভোক্তা শ্রেণি তৈরি করা যাচ্ছে না। যার ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক বা খামারিরা সেভাবে দাম পাচ্ছেন না। চালের ব্যাপারে একধরনের ধোঁকাবাজি (বাজার ব্যর্থতা) চলছে। মোটা চাল কেটে সরু করার প্রক্রিয়ায় ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছে। জাতভিত্তিক চাল বিক্রি হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ বা ভোক্তাশ্রেণির মধ্যে অবিশ্বাস বা সন্দেহ দূর করে বাজারে কার্যকর চাহিদা তৈরি করা গেলে ভোক্তা ও উত্পাদক উভয়েই লাভবান হবে এবং এতে মুক্তবাজারি অর্থনীতিতে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারের মূল নীতি ‘মূল্য ভারসাম্য’ অর্জন সহজ হবে।
লেখক: সামষ্টিক পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
