মর্যাদাপূর্ণ সুন্দর সমাজজীবন হোক সবার

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩, ১১:০১

জীবনযাপনের নানা অনুষঙ্গের মধ্যে মর্যাদা-অমর্যাদা অনুভূত হয়ে থাকে। যেমন—আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা, চালচলন আমাদের কখনো বিষাদিত অথবা আনন্দিত করে। মর্যাদা মনে স্বস্তি আনয়ন করে আর অমর্যাদা মনে অস্বস্তির ছায়া ফেলে। মনুষ্যত্ব-মমত্ববোধই মর্যাদাকে ধারণ করে। এই বোধটা পেতে জ্ঞানালোকিত পথে হাঁটতে হয়। এই পথই মর্যাদার পথ। এই পথে মর্যাদাবান মানুষ তৈরি হয়। কাউকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা মর্যাদার নামান্তর। কাউকে অমর্যাদা করা নিজেকে মর্যাদাহীন করার শামিল। সেটা পারিবারিক বলয় হোক কিংবা সামাজিক কিংবা দৈশিক বলয় হোক, তা অমর্যাদাকর বলয়রূপে পরিচিতি পায়। জনকল্যাণ বলে যে শব্দটি আমরা উচ্চারণ করি, তা জনকল্যাণকর রূপে পরিচিতি পায় কি না, তা ভাবার বিষয়। তা জন-অধিকারের স্বার্থকে সমুন্নত রাখে কি না, তা-ও ভাবার বিষয়। জনস্বার্থ বিঘ্নিত সমাজ তো মর্যাদার সমাজ নয়, যা জন-অসন্তোষে রূপ নেয়। দেখা যায়, হঠাত্ করেই কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মিথ্যাচারে ভোক্তাসাধারণ জিম্মি হয়ে পড়ে, শোষণ-বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতির সমাজকে তো মর্যাদার সমাজ বলা যায় না। কেমন একটা হরিলুটের কাণ্ড ঘটায় ওরা। আমরা প্রত্যহই তো জ্ঞাত হই, অসামাজিক কত অনাচারের কাহিনি, যা স্তব্ধ করে দেয় আমাদের মনকে। সমাজজীবনে যারা সুস্থ মানসিকতা নিয়ে চলতে চায়, তাদের জন্য এসব বিড়ম্বনার শামিল। তাদের বেশি করে ব্যথিত করে।

কারো কাছ থেকে অস্বস্তিদায়ক কোনো কিছুই তো মর্যাদাকে ধারণ করে না। এই তো এখানকার পায়ে চলার পথ। এ তো দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক হয়েই পড়ে থাকে। খানাখন্দে ভরা। খোঁড়াখুঁড়ি যেন শেষই হয় না এর। হয়তো-বা ঠিক হলো, কিছুদিন পর আবার খোঁড়াখুঁড়ি আরম্ভ। এভাবেই তো চলছে। দুর্নীতির এটাই বুঝি নিয়ম-নীতি! বৃষ্টি হলেই পানিতে সয়লাব। এই পথে কত জন হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায়। ব্যথা পায়। কারো হাত-পা-মাথায় আঘাত লাগে, আহত হয়। হায়! এই পায়ে চলার পথ চরম অবহেলিত ও বৈষম্যপূর্ণ হয়েই পড়ে থাকে। বড়লোকেরা চলবে তাদের সুন্দর রাস্তায় গাড়ি হাঁকিয়ে মনের সুখে কোলাহল করে। আর সাধারণের পায়ে চলার পথটা পড়ে থাকবে বেহালদশায়। এখানেও বৈষম্য! মনে করি, সমতাভিত্তিক সামষ্টিক উন্নয়নই মর্যাদার সমাজচিত্র। এছাড়া এই কল্পনা নিরর্থক।

গণপরিবহনেও নৈরাজ্যকর অবস্থা। এখানে আছে হাইড্রলিক হর্নের শব্দদূষণের চূড়ান্ত রূপ। আছে বেপরোয় গাড়ি চালানো। আছে কে আগে যাবে তার পাল্লাপাল্লি। আছে গাদাগাদি করে যাত্রী নেওয়া। আছে নারী যাত্রীদের চরম ভোগান্তি। এর মধ্যে মানুষ কীভাবে নিজেকে নিরাপদ স্বস্তিদায়ক মনে করবে? কীভাবে স্বস্তিতে পথ চলবে? প্রতিদিন দুর্ঘটনা। ভাড়া বিড়ম্বনা তো আছেই। মানুষ অতিষ্ঠ। মর্যাদাহীন পরিবেশের মধ্যে যেন মানুষ বাঁধা পড়ে গেছে। ঝগড়াঝাটির সংস্কৃতিই এখানে গড়ে উঠছে। চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে কোনো যাত্রীকে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে। সর্বনিম্ন ১০ টাকা ভাড়া। স্বল্প দূরত্ব হলেও ১০ টাকাই দিতে হয়। শোষণের পরাকাষ্ঠা নয় কি এটা? জনস্বার্থ ও জনকল্যাণ শব্দ দুটি অলিক স্বপ্ন হয়ে পড়ে আছে। তা জনসাধারণের ধারে-কাছে নেই। সুস্থ-সুন্দর মনের সুসভ্য জাতির বৈশিষ্ট্য তো এ রকম নয়। তাহলে কি আমাদের নিয়তি হবে অসভ্য মগফিরিঙ্গি হয়ে বেঁচে থাকা?

মনীষীরা যুগে যুগে সত্যিকারের মর্যাদার পৃথিবী গড়ে তুলতে চান। এজন্য তারা জ্ঞানালোকিত পথে মানুষকে প্রেমসিক্ত আহ্বান জানান। কল্যাণকর সংস্কৃতিচর্চায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন, যাতে করে মর্যাদার মানুষ গড়ে উঠতে পারে। এভাবেই তারা নিষ্পাপ মর্যাদার পৃথিবী গড়তে এবং পাপে নিমজ্জিত পৃথিবী উদ্ধারে জীবনব্যাপী ব্যস্ত থাকেন। মানুষ নামের কতক পাপাচারী যখন মানুষ থাকে না, হয়ে পড়ে অমানুষ; পৃথিবী নিয়ন্ত্রণে শোষণ-বঞ্চনার শক্ত বলয় তৈরি করে নেয়। তাদের বিরুদ্ধেই এই মনীষীদের দৃঢ় অবস্থান; অত্যাচারিত-নিপীড়িত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য তারা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে। সমতাভিত্তিক বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়দীপ্ত চিন্তা তাদের আবিষ্ট করে রাখে। মানবিকতা ও মনুষ্যত্ববোধ চর্চার জীবনযাপনই তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে থাকে। তারাই উজ্জ্বল নক্ষত্রসম মর্যাদার ধারণশক্তি। যখন পাপে পাপে পৃথিবী ভরে যায়, জনজীবনে স্বস্তির কিছু থাকে না, মিথ্যাচার-পাপাচার জীবনের সঙ্গী হয়ে পড়ে, সর্বক্ষণ স্বার্থচিন্তা বড় হয়ে দেখা দেয়, পারস্পরিক সৌহার্দ হারিয়ে যায়, এ রকম একটা ঘোর তমসা দূরীভূত করার জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতি আমাদের কল্যাণকর ভরসার বড় জায়গা হতে পারে। আমরা তা গ্রহণ করতে পারি। মনীষীদের চাওয়াটা আমাদেরও চাওয়া হওয়া উচিত। তাহলেই স্বস্তিময় ও শান্তিময় মর্যাদার সমাজ পাব আমরা। এ কাজে সাহিত্য-সংস্কৃতি আমাদের বড় সহায়। জ্ঞানহীন স্বার্থচিন্তায় বেহালদশার সমাজ সংস্কারে এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

মানুষকে বাদ দিয়ে নিজেকে মর্যাদাবান ভাবা বাতুলতা ছাড়া আর কী? যে মানুষটি অমর্যাদা ও অবহেলার শিকারে পরিণত হয়েছে, তার এই পরিণতিতে তো গোটা সমাজই মর্যাদাহীন হয়ে যায়। 

সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেওয়াই মর্যাদার চূড়ান্ত রূপ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর বেলায় আমরা তা দেখেছি। মনুষ্যত্ব-মর্যাদা ও ন্যায়বোধের কী পরাকাষ্ঠাই না ছিল তার মধ্যে। তিনি অর্ধেক জাহানের খলিফা হয়েও তার মধ্যে বড়ত্বের কোনো অহমিকা ছিল না। রাষ্ট্রের অখ্যাত একজন মানুষকে নিয়ে পালাক্রমে উটের রশি ধরে দুর্গম মরুপথ পাড়ি দিয়েছিলেন। জেরুজালেমে গিয়েছিলেন। মনুষ্যত্বের পবিত্র পরশে আসন্ন একটি যুদ্ধকে তিনি প্রশমিত করেছিলেন। অন্যকে মর্যাদা দিয়ে নিজের মর্যাদাকে সমুন্নত রেখেছিলেন।

পীড়াদায়ক আচরণ মর্যাদাকে ধারণ করে না। শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মনে দুঃখের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে উড়ে বেড়ায়। অন্যকে অমর্যাদা-অসম্মানকর বলয়ে রেখে নিজেকে মর্যাদার অধিকারী করা বা ভাবাও অমর্যাদাকর। কাউকে দুঃখের সাগরে রেখে নিজে সুখসাগরে হাবুডুবু খাওয়া মর্যাদাকে ধারণ করে না। মানুষকে শোষণ-বঞ্চনার মধ্যে ফেলার অশুভ মানসিকতা, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার হীন কৌশল মর্যাদাকে ধারণ করে না। রাষ্ট্রের কেউ এক জন রাস্তায় হাতপাতা হয়ে পড়ে থাকবে, তার উন্নয়ন না করে  মর্যাদাকে ধারণ করা যায় না। আজ কোনো রাষ্ট্রই মানবতা ও মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে চিন্তা করে না। যদি করত, তাহলে দেশে দেশে শরণার্থীদের আহাজারি শুনতে হতো না। মানবেতর জীবনের করুণ পরিণতিতে তাদের পড়তে হতো না। ভিক্ষাবৃত্তি-টোকাই-শরণার্থী—এই দুঃখময় শব্দগুলোর জন্ম হতো না। কতক পাপাচারী মানুষের স্বার্থচিন্তার অকল্যাণকর কার্যকলাপই এর জন্য দায়ী—এটাই মূল কথা। অস্বস্তির তীব্র দুঃখবোধ মানুষের মনে প্রবহমান আজ। মর্যাদাবোধের মানুষ সৃষ্টির সেই আবহও নেই। সেই পরিবেশও নেই। এজন্যই অঞ্চলভিত্তিক গড়ে উঠছে কিশোরদের আধিপত্যের গ্যাং।

মওলানা ভাসানীর ‘মাও সেতুঙের দেশে’ বইটির একটি ঘটনা আমাকে দারুণ আপ্লুত করেছিল। পিকিংয়ের হাসপাতালে মওলানা চিকিত্সাধীন ছিলেন। চৌ এনলাই গেলেন তাকে দেখতে। মওলানা একটি কারণে অবাক হয়েছিলেন, তা হলো একজন প্রধানমন্ত্রী গেছেন হাসপাতালে, তার জন্য কোনো রকম সাদর-সংবর্ধনার কিছুই ছিল না। যে যার মতো কাজ করে যাচ্ছিল। আলাদাভাবে চৌ এনলাইকে মর্যাদা দিতে হয়নি কাউকে। সমুন্নত মর্যাদার একটি সুন্দর উদাহরণ ছিল সেটা। আজ যেটা সত্য, তা হলো সমাজজীবনে এ ধরনের মর্যাদাবান সচ্চিন্তার মানুষের অভাব। তাই আজ দেশে দেশে অমর্যাদার ঘৃণ্য স্রোতধারা প্রবাহিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এএইচপি