পরিবেশ পুলিশের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ১৫:৩৬

পরিবেশ সম্ভবত বর্তমান বিশ্বের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে অন্য প্রচেষ্টার পাশাপাশি পরিবেশ পুলিশ কীভাবে এবং কী কী কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে একটু আলোচনা প্রয়োজন।

পরিবেশ পুলিশ শিল্প, কলকারখানা, যানবাহন, ইটভাটা, মৃত্তিকা, পানি, পলি, শব্দ উৎপাদনকারী মেশিন ইত্যাদির ওপর জরিপ করবে। শিল্প ও কলকারখানায় পরিবেশবান্ধব টিট্রমেন্ট প্ল্যান্ট আছে কি না, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কীরূপ দূষণ ও কীভাবে দূষণ করছে; যেসব বর্জ্য, বর্জ্যপানি ও এফলুয়েন্ট নির্গত করছে, সেগুলো দূষণের অনুমোদিত মাত্রা অতিক্রম করছে কি না, তা পরীক্ষা করবে। এবং এ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে, তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যাটাগরাইজ করবে। পরিবেশ পুলিশ যানবাহন, ইটভাটা, মৃত্তিকা, পানি ও পলি দূষিত কি না এবং দূষণের উৎস খুঁজে বের করবে। তাছাড়া কোন কোন হোটেল, রেস্তোরাঁ, মেশিন ও ইঞ্জিন শব্দদূষণ করছে সেগুলো নির্ণয় করবে। পরিবেশ পুলিশ সব তথ্য বিশ্লেষণ করে তথ্যকে ইন্টেলিজেন্সে পরিণত করবে। এটি প্রতিনিয়ত আপটেড বা হালনাগাদ করবে। পরিবেশ পুলিশ তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ করবে, সেগুলো সংরক্ষণ করবে এবং এগুলো নিয়ে একটা ডাটাবেইজ তৈরি করবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত, শিল্প খাত, বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাতসমূহ থেকে গ্রিন হাউজ গ্যাস উৎপাদিত হয়। এছাড়া রেফ্রিজারেটর থেকে সিএফসি (ক্লোরোফ্লোরো কার্বন) উৎপাদিত হয়। বিভিন্ন সেক্টরে ব্যবহূত জীবাশ্ম জ্বালানি, যেমন—পেট্রোলিয়াম, ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি থেকে বাংলাদেশে গ্রিন হাউজ গ্যাসের সিংহভাগ উত্পাদিত হয়ে থাকে।         

পরিবেশ পুলিশ ইউনিফরমে এবং সাদা পোশাকে তথ্য সংগ্রহ করে তথ্যকে ইন্টেলিজেন্সে পরিণত করতে পারবে এবং ইন্টেলিজেন্স বেইজড অভিযান পরিচালনা করতে পারে এবং অপরাধীদের আটক করে বিচারের নিমিত্তে আদালতে সমর্পণ করতে পারবে। যেহেতু পুলিশ কর্মকর্তারা আইনে দক্ষ; সেজন্য তারা পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশসংক্রান্তে সঠিকভাবে মামলা করতে পারবে। পরিবেশ পুলিশের সদস্যরা অভিযোগ দেবে, নিজেরা বাদী হয়ে মামলা করবে, জব্দতালিকা তৈরি করবে, সাক্ষী হাজির করে এবং নিজেরা সাক্ষ্য দিয়ে এবং তদন্তকাজে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সহায়তা করে মামলার শাস্তির লক্ষ্যে আদালতকে সাহায্য করতে পারবে। তাছাড়া পরিবেশ পুলিশ ক্রাইমসিন সংরক্ষণে, ক্রাইমসিন উদ্ধারে এবং তদন্তসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে। পরিবেশ পুলিশ ক্রাইম প্রসিড অ্যানালাইসিস, লিংক অ্যানালাইসিস ইত্যাদির মাধ্যমে মামলার ছায়া তদন্ত করতে পারে, এমনকি প্রয়োজনে আদালত বা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নিজেরাও মামলা তদন্ত করতে পারবে।

একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয় যে, বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশেও মানুষের একরূপ ম্যানিয়া হয়ে গেছে যে, বনবনানী, জঙ্গল, পাহাড়ি জঙ্গল, লতাপাতা, ধানগাছ, ধানের খড়, গমগাছ, গমের খড়, আখের খেত ইত্যাদি পেলেই সেগুলোতে অগ্নিসংযোগ করা। অগ্নিসংযোগের কারণে বনজঙ্গল, বৃক্ষরাজি, পোকামাকড় এবং অনুজীবসমূহ ধ্বংস হয়, পাখির খাবার ও আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যায়, যা না করে যান্ত্রিক উপায়ে শস্যভূমি ও পাহাড় পরিষ্কার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবেশ পুলিশ অংশীজনদের সঙ্গে মিশে তাদের কাউন্সেলিং করে এসব সমস্যাসমূহ নিবারণ করতে পারবে।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়সমূহ রক্ষা করতে হলে প্রথমে পাহাড়কাটা বন্ধ করা, পাহাড়ি মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার না করা এবং পাহাড়গুলোতে যে বনজঙ্গল রয়েছে সেগুলোতে যেন অগ্নিসংযোগ না-করা হয় এবং বৃক্ষ লতাপাতা যেন না-কাটা হয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখবে। এছাড়া পাহাড় ধ্বংস বা ক্ষয় রোধে পাহাড়ে মাটি আটকে রাখে এরূপ বৃক্ষ, মুলিবাঁশ, ভেটিভার গ্রাস প্রভৃতি চাষ করলে পাহাড়গুলো রক্ষা পাবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মানুষদের বুঝিয়ে পাহাড় ও পাহাড়ি জঙ্গল সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

 দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও অসংখ্য ইটের ভাটা সক্রিয় রয়েছে, যেগুলি কাঠ, পাহাড়ি মাটি ও ফসলি জমির উর্বর মৃত্তিকা ব্যবহার করছে মর্মে সূত্র থেকে জানা যায়। এক্ষেত্রে পরিবেশ পুলিশ মৃত্তিকা সংরক্ষণে তথ্য সংগ্রহ করে ও আইনের প্রয়োগ করতে পারে।

পরিবেশ ডিপার্টমেন্টের (DOE) এক তথ্য থেকে জানা যায় ঢাকা নগরীর বাতাসে দূষণের মাত্রা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। তাছাড়া নির্মাণকাজ থেকে বাতাসে ধূলিকণা যোগ হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়। পরিবেশ পুলিশ বায়ু দূষণকারী সব প্রতিষ্ঠান, ইটভাটা ও যানবাহনের ওপর নজরদারি করবে। তারা সব অংশীজনের সঙ্গে মিশে ও প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বায়ুদূষণ বন্ধ করতে পারে।

বাংলাদেশে পানিদূষণ হচ্ছে শিল্প, গৃহস্থালি, মিউনিসিপ্যালটির বর্জ্য এবং শস্যখেতে ব্যবহূত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাধ্যমে যেগুলি ডাম্পিং, সেচ ও বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদী, খালবিল ও অন্যান্য জলাশয়ের পানিতে মিশ্রিত হয় এবং দূষণ ঘটায়। পরিবেশ পুলিশ এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, মানুষকে সচেতন করা এবং শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে মোবাইল কোর্ট করে শাস্তি প্রদানে কাজ করতে পারে।

সাধারণত দেখা যায় এশিয়ার দেশগুলোতে কোনো নতুন শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোনো স্থাপনা তৈরি করতে হলে নিচু ভূমি ও জলাশয় ভরাট করা হয়। কিছু অসাধু লোকের কাজই হলো জলাশয় দখল করা এবং সেখানে হাউজিং, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র, পর্যটন স্পট, কৃষি খামার ও খামারবাড়ি গড়ে তোলা। এর ফলে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, ফসলি জমি, জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এবং ইকোসিস্টেম নষ্ট হচ্ছে। আমরা শহর ও বাড়িঘরের আনুভূমিক (Horizontal) সম্প্রসারণের পরিবর্তে উলম্ব (Vertical) সম্প্রসারণের দিকে যেতে পারি। তাহলে আমাদের ভূমি বাঁচবে, আর মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ পুলিশ অসাধু লোকদের কাউন্সেলিং করতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিপন্ন প্রাণী, পাখি, মাছ এবং উদ্ভিদ রক্ষার্থে পরিবেশ পুলিশ :২০১৯ সালের মত্স্য সপ্তাহের বুলেটিন থেকে জানা যায় ৩০ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং ৯টি প্রজাতির মাছ বিপন্নের পথে, প্রজাপতির ৩০৫টি প্রজাতির মধ্যে ১৮৮টি প্রজাতি হুমকির সম্মুখীন। আইইউসিএন (IUCN)-এর ২০১৫ সালের একটি গবেষণা থেকে জানা যায় ৩০৫টি প্রজাতির পাখির মধ্যে ১৯টি প্রজাতির পাখি বাংলাদেশ থেকে ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরিবেশ পুলিশ অভয়াশ্রম রক্ষায় নিরীক্ষণ করবে এবং বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। এছাড়া তারা বন্যপ্রাণী রক্ষায় মানুষকে প্রেষণা দেবে।

আমাদের দেশে এখন বৃক্ষনিধন কমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। সুতরাং সময় এসেছে বৃক্ষ উজাড় না করে নতুন করে ব্যাপক মাত্রায় বনায়ন করার। পরিবেশবান্ধব, ফলদ, বনজ, ও ঔষধি বৃক্ষের চারা রোপণ করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে বনায়ন, ব্যক্তিগত বনায়ন, অফিস-আদালতে বনায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বনায়ন, সামাজিক বনায়ন, পারিবারিক বনায়ন, ছাদ কৃষি, আঙিনা কৃষি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা, বৃক্ষ কর্তন বন্ধ ও সব উপায়ে বনায়ন কার্যক্রম চালানোর ওপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ পুলিশ জনগণকে বুঝিয়ে এবং প্রেষণা দিয়ে বনায়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে পারে ও একত্রে কাজ করতে পারে।

পরিবেশ পুলিশ সচেতনতা সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তারা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পথসভা, উঠান বৈঠক, ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষকে বোঝাবে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে বোঝাবে, র্যালি, লিফলেট, পথনাটক, দেওয়ালিকা বের করবে, স্কুল-কলেজে ও বিভিন্ন সামাজিক জমায়েতে বনায়ন ও পরিবেশ সম্পর্কে বক্তৃতা ও বিবৃতি দিয়ে মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে পারে এবং পরিবেশ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করবে এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।

আমাদের পরিবেশের ধ্বংস রোধ করতে হবে, পরিবেশের সব উপাদানকে রক্ষা করতে হবে, সব কাজের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রাধিকার সর্বাগ্রে রাখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কারো আর বসে থাকার সময় নেই। পরিবেশের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে ও সুচারুভাবে নির্ণয় করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে এক বিরল মিথস্ক্রিয়া করার যোগ্যতা ও সক্ষমতা সেজন্য বাংলাদেশের বর্তমান চলমান পরিবেশসংক্রান্ত অপরাধসমূহ দমন করা এবং পরিবেশ উন্নয়নে পরিবেশ পুলিশ এক বড় ভূমিকা পালন করতে  পারে। তারা  সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করতে পারে। তাহলে দেশের জীববৈচিত্র্য এবং ইকো সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত হবে। তাই পরিবেশ পুলিশ একান্ত প্রয়োজন।

লেখক: পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন