ধরিত্রী এবং মস্তিষ্কের উষ্ণায়নে অস্থির এই বিশ্ব

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩, ০৭:০০

ভয়াল গ্রীষ্মে দুর্বার দাবদাহ ছড়াইয়া পড়িতেছে ইউরোপ আমেরিকা তথা উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশে। ইতালিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটি এই দাবদাহের নাম দিয়াছে ‘সার্বারাস হিটওয়েভ’। ইহার পূর্বে গত বছর ইউরোপের আবহাওয়াবিদরা গরমের প্রচণ্ডতার তুলনা টানিয়াছেন ‘নরকের আগুন’-এর সহিত। আর এইবার তুলনা টানা হইল ‘সার্বারাস’-এর উদাহরণ দিয়া। গ্রিক পুরাণে ‘সার্বারাস’ হইল একটি তিন মাথাওয়ালা কুকুর। এই কুকুরটি প্রেতপুরীর পাহারাদার, যে কিনা মৃতদের সেই আন্ডারওয়ার্ল্ড হইতে বাহিরে যাইতে বাধা দেয়।

উদাহারণগুলি প্রতীকী; কিন্তু উহা প্রচণ্ড গরমের ভয়াবহতা বুঝাইতে আমাদের চিন্তাকে উসকাইয়া দেয়। কয়েক দিন পূর্বে ইতালীয় রাজনীতিবিদ নিকোলা ফ্রেটোয়ান্নি টুইটে বলিয়াছেন—আমরা অসহনীয় তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হইতেছি। দেশে দেশে হিটস্ট্রোকের প্রতিবেদনগুলি আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আমরা ধাবিত হইতেছি এক দুর্বিষহ ভবিষ্যতের দিকে। গত বছর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের ফলে ইউরোপে প্রায় ৬২ হাজার মানুষ মারা গিয়াছে। গতকাল ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় ইতালির ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হইয়াছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) জানাইয়াছে, আগামী সপ্তাহে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডে চরম পরিস্থিতি দেখা যাইতে পারে। ইএসএ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্থল ও সমুদ্রের তাপমাত্রা নিরীক্ষণ করে। দুই বছর পূর্বে আগস্টে সিসিলিতে মহাদেশের এখন পর্যন্ত উষ্ণতম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হইয়াছিল ৪৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পূর্বাভাস অনুসারে, এই বছর আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাপমাত্রা ঐ স্তরে পৌঁছাইতে পারে।

এইদিকে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান তাপপ্রবাহ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাইয়া গিয়াছে। আরও প্রচণ্ড হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়াশিংটন রাজ্য পর্যন্ত জারি হইয়াছে সতর্কতা। সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে তাপসম্পর্কিত কারণে প্রতি বছর প্রায় ৭০০ মানুষ মারা যায়। গত শুক্রবার ও শনিবারে ব্যতিক্রমীভাবে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। কিছু এলাকায় ফোসকা পড়া তাপ থাকিবে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত। আশঙ্কা করা হইতেছে পৃথিবীর সবচাইতে উষ্ণ স্থানগুলির একটি ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে সর্বকালের উচ্চ তাপমাত্রা ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) ১৮৫০ সাল হইতে বিশ্বে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখিতেছে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিল বিংশ শতাব্দীর গড় তাপমাত্রার চাইতে ১ দশমিক শূন্য ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অধিক, যাহা এইবারই প্রথম। বলা যায় এই বছরের জুন মাসটি ছিল ১৭৪ বছরের মধ্যে সবচাইতে উষ্ণতম মাস। এনওএএর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণাকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান বার্কেলে আর্থ ও ইউরোপের কোপারনিকাসের মতো আবহাওয়ার উপর নজরদারি করা প্রতিষ্ঠানগুলিও গত জুনকে রেকর্ড রাখা শুরুর পর হইতে সবচাইতে উষ্ণ জুন মাস হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছে।

১৭৪ বছরের তথ্য-উপাত্তে গত দুই দশক ধরিয়াই জুন মাস বারংবার রেকর্ড ভাঙার খেলা চলিতেছে। জলবায়ুতে বারংবার রেকর্ড ভাঙার এই খেলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইহা এই ইঙ্গিত দেয় যে, জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন ঘটিতেছে—যাহা পুরা পৃথিবীর জন্য অশনি সংকেত। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রহিয়াছে মানুষেরই কর্মকাণ্ড। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই প্রকৃতির এই উষ্ণায়ন, অন্যদিকে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে চলিতেছে রাজনৈতিক উষ্ণায়ন। প্রকৃতির গরমের সহিত মানুষেরও যেন মাথা গরমের মাত্রা বাড়িয়া গিয়াছে। আর ‘মাথা গরম’ থাকিলে যাহা হয়—সংঘাত হানাহানি, নির্বুদ্ধিতা আর হঠকারী কর্মকাণ্ড বেশি বেশি করিয়া চারিদিকে দেখা যায়। ইহা তো কাম্য নহে। এই একটাই পৃথিবী আমাদের। ইহাকে বসবাসের উপযুক্ত রাখিতে হইবে। এইখানে পরিবেশ এমন প্রেতপুরীর মতো হওয়া উচিত নহে, যেইখানে ‘সার্বারাস’ দিয়া জীবন্মৃতদের পাহারা দিতে হইবে। রক্ষা করিতেই হইবে এই পৃথিবীকে, সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন