বাজেটের তৃতীয় ভাগে থাকে অর্থায়নের (Financing) হিসাব। বাজেটে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট (Deficit Budget)’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। এবারেরটিও তাই। ‘ঘাটতি বাজেট’ নীতিবাচক শোনালেও এটা নীতিবাচক কোনো বিষয় নয়। আইএমএফের তথ্যমতে কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো-ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বাজেটই ‘ঘাটতি বাজেট’।
মহান জাতীয় সংসদে এবারের বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’। অনুমোদিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে কেমন করে অর্জিত হবে বাংলাদেশে গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা দলিলসমূহ, কেমন করে রক্ষা হবে নির্বাচনি ইশতেহারের অবশিষ্ট অঙ্গীকার—এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
আলোচনার শুরুতেই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব, কারণ তার হাত ধরেই বাংলা ভাষায় ‘বাজেট’ শব্দের আগমন। শ্রদ্ধেয় আকবর আলি খানের ‘বাংলাদেশে বাজেট :অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে আমরা পাই, ‘বাজেট ইংরেজি শব্দ। মধ্যযুগের ইংরেজি বুজেট (Bougette) থেকে এর উত্পত্তি। বুজেট অর্থ মানিব্যাগ বা টাকার থলি। .... ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় বাজেট শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।’ মহান সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আইনি ভিত্তি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। অথচ সংবিধানে ‘বাজেট’ শব্দটিই নেই, আছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’। সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রতি অর্থবত্সর সম্পর্কে উক্ত বছরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ নামে অভিহিত) সংসদে উপস্থাপিত হইবে।’ এই বিবৃতিই আসলে ‘বাজেট’। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আওতায় ৮১ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্ণিত আছে। তাছাড়া ‘অর্থবছর’ সম্পর্কে ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘“অর্থ-বত্সর” অর্থ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে যে বত্সরের আরম্ভ।’ সরকারের অর্থ বিভাগ প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের বিধান সাপেক্ষে সরকারি অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণ ধারণযোগ্য পর্যায়ে রাখা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাজেট প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে প্রণীত হয়েছে ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’। বর্তমানে এই আইন এবং সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪, রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬, জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস ইত্যাদির বিধান মোতাবেক পরিচালিত হয়ে থাকে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
মহান সংসদে বাজেট উপস্থাপন এবং সংসদীয় বিতর্ক অনুষ্ঠানের রীতিনীতি বর্ণিত আছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি’তে। এই বিধির ‘আর্থিক বিষয়সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি’ শিরোনামের ষোড়শ অধ্যায়ের আওতাধীন ১১১ থেকে ১২৯ নম্বর বিধিতে বাজেট, মঞ্জুরি দাবি, নির্দিষ্টকরণ বিল, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট, ছাঁটাই প্রস্তাব, প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা আছে। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ১২৭ (৫) বিধিতে বলা হয়েছে ‘“অর্থ বিলটি বিবেচনার্থে গ্রহণ করা হোক” মর্মে প্রস্তাব উত্থাপিত হইলে যে কোনো সদস্য সরকারের দায়িত্বাধীন সাধারণ প্রশাসন, স্থানীয় অভাব-অভিযোগ বা সরকারের আর্থিক নীতি সম্পর্কিত বিষয় আলোচনা করিতে পারিবেন।’ যদিও সংসদে বাজেট বিতর্কের কার্যকারিতা ও উত্কর্ষতা নিয়ে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও সন্দেহ আছে। তথাপি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় বাজেট নিয়ে যত বেশি বিতর্ক হবে, গঠনমূলক সমালোচনা হবে, বাজেট তত শানিত হবে, হবে জনমুখী।
আমরা সবাই জানি, কাঠামোগত ভাগে বাজেটের তিনটি অংশ। প্রথম ভাগে থাকে আয়ের হিসাব। সরকারের আয়ের আবার তিনটি উত্স—১) জনগণের প্রদেয় কর (এনবিআর এবং অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক আদায়), ২) করবহির্ভূত আয় (ফি, লভ্যাংশ, অর্থদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি) এবং ৩) বৈদেশিক অনুদান।
বিগত সময়ে আয়ের বড় অংশ আসত বৈদেশিক অনুদান থেকে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার বাজেটে অনুদানপ্রাপ্তি খাতে ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৩০৫ কোটি (৫.১৩%) টাকা। বর্তমান অর্থবছরে অনুদান প্রস্তাব নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫১২ শতাংশে। অনুদান নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসছে বর্তমানের বাংলাদেশ। কিন্তু রাজস্ব আদায়ে আমাদের আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যে, ‘আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম।’ বর্তমান বাজেটে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত জিডিপির (৫০ লাখ, ০৬ হাজার, ৭৮২ কোটি টাকা) ৮ দশমিক ৯৮৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন Article IV মোতাবেক বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত খুবই হতাশাজনক। গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সভায়ও রাজস্ব বোর্ডের কাছে কর-জিডিপির অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে করব্যবস্থা সংস্কার, অব্যাহতি হ্রাস ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর রূপরেখা জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। বাস্তবতা হলো, কারো পরামর্শ বা শর্ত বাস্তবায়নের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই কর সংস্কৃতির উত্তরণ অত্যাবশ্যক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে Sitting Duck অথবা Low Hanging Fruits-এর মতো সহজ শিকার ধরার কৌশল থেকে বের হয়ে এসে করদাতাদের আস্থা অর্জন সময়ের একান্ত দাবি।
বাজেটের দ্বিতীয় ভাগে থাকে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয়ের (expenditure) হিসাব। অ-অর্থনীতিবিদগণ বাজেট বলতে বাজেটের ব্যয়ের হিসাবকেই বুঝে থাকেন। সম্ভাব্য ব্যয় চারটি ভিন্ন খাতে বিভক্ত করা হয় :১) পরিচালন ব্যয় (Operating Expenditure) প্রস্তাব করা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা; ২) খাদ্য হিসাবে (Net Outlay for Food Account Operation) ৫০২ কোটি টাকা; ৩) ঋণ ও অগ্রিম (Loans & Advances) বাবদ পরিশোধ ৮ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং ৪) উন্নয়ন ব্যয় (Development Expenditure) প্রস্তাব করা হয় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। বাজেটে ব্যয় সমন্বয় আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সরকারের জন্য চেলেঞ্জিং। উদাহরণ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিবর্তন অবতারণা করা যেতে পারে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে পরিচালন ও উন্নয়ন মিলে সাকল্যে বরাদ্দ ছিল ১৩৯১৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা, যেখানে চলমান ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধু সার, সেচ, বীজ ইত্যাদি খাতে ‘প্রণোদনা অথবা ভর্তৃকি’ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬৬৯২ দশমিক ৯১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ২৫১২২ দশমিক ৪৮ কোটি টাকার ৬৯ দশমিক ৭৯ শতাংশই (১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা) খরচ হবে ভর্তুকি বাবদ। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় বৈদেশিক উত্স থেকে সরকার কর্তৃক ইতিপূর্বে গৃহীত ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি চলমান অর্থবছরে সংশোধিত বাজটে ঋণ পরিশোধ খাতে ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকার স্থলে এই অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৮ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি। সেই তুলনায় উন্নয়ন বাজেট বেড়েছে অতি সামান্য।
বাজেটের তৃতীয় ভাগে থাকে অর্থায়নের (Financing) হিসাব। বাজেটে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট (Deficit Budget)’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। এবারেরটিও তাই। ঘাটতি বাজেটের অর্থের সংস্থান করা হয় দেশি-বিদেশি উত্স থেকে ঋণ করে। বিদ্যমান বাজেটের তৃতীয় ভাগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা, তন্মধ্যে বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ০২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ঋণ ১ লাখ ৫১৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। ‘ঘাটতি বাজেট’ নীতিবাচক শোনালেও এটা নীতিবাচক কোনো বিষয় নয়। আইএমএফের তথ্যমতে কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো-ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বাজেটই ‘ঘাটতি বাজেট’। যুক্তরাষ্ট্রের Office of Management and Budget কর্তৃক প্রকাশিত Budget of The US Government Fiscal Year ২০২২ মোতাবেক ২০২২ অর্থবছরে তাদের মোট ৬ হাজার ১১ বিলিয়ন ডলারের বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল তাদের জিডিপির (২৩ হাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার) ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের এই বাজেটে ঘাটতি ধরা আছে জিডিপির (৫০ লাখ ০৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা) ৫ দশমিক ২ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতির এই হার মোটেও আশঙ্কাজনক নয়।
মধ্যমেয়াদি বাজেট-কাঠামোয় (এমটিবিএফ) বাজেট মূলত একটি তিন বছরের পরিকল্পনা। সংসদে উপস্থাপিত বাজেট মূলত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাক্কলন এবং ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ। অর্থাত্, বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে সরকার বিদ্যমান উন্নয়ন পরিকল্পনা দলিলে উল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রয়াস নিয়ে থাকে। বাজেট বরাদ্দের খাতসমূহের ধরনে রাষ্ট্রের মৌলিক চিত্র ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে সরকারের দায়বদ্ধতা ও অগ্রাধিকার খাত। শ্রদ্ধেয় মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া রচিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার :দেশ নির্মাণের মৌলিক রূপরেখা’ গবেষণাধর্মী বই থেকে আমরা পাই, স্বাধীন দেশে সরকারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল কৃষকের জন্য হিতকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বাধীন দেশের প্রথম মন্ত্রিসভার প্রথম সভার ১ নম্বর সিদ্ধান্ত ছিল ‘(ক) ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বকেয়া ও সুদসহ সব কৃষিজমির সব ধরনের খাজনা মওকুফ করা হয়’। বর্তমান সরকার জাতির পিতার দেখানো ‘মৌলিক রূপরেখা’ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে। ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ নীতিতে অটল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে চলতি অর্থবছরের জন্য বাজেট, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে—এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক: উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়

