খতিয়ান শূন্য

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ০৪:০০

আমাদের পরম সৌভাগ্য, আর্যভট্ট মহাশয় শূন্য উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি যদি হাজার দেড়েক বছর আগে এই অভূতপূর্ব আবিষ্কার না করতেন, তাহলে আজকের যুগে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় কী যে সব্বনাশ হতো, তা ভেবেই গা শিউরে ওঠে। আবার আরেকভাবে বললে বলা যায়, ঐ মহাশয় শূন্য আবিষ্কার করে আমাদের ফেলে গেছেন এক বিশাল গাড্ডার মধ্যে। তার উদ্ভাবিত শূন্যই লটকে যাচ্ছে আমাদের অনেকের ললাটে।

যারা জমি-জিরেতের মালিক, তারা অবধারিতভাবেই দাগ-খতিয়ান শব্দের সঙ্গে পরিচিত। ১৮৯০, ১৯৫৫, ১৯৬৬ আর ১৯৮৫—একেক সময়ে শুরু হওয়া ভূমি জরিপে প্রতি খণ্ড জমি অনন্য (Unique) দাগ নম্বর দিয়ে চিহ্নিত। প্রতিটি মৌজার একটি করে মৌজা ম্যাপ তৈরি হয়। সেই মৌজা ম্যাপে মৌজার প্রতিটি জমি সুস্পষ্টভাবে মানচিত্রভুক্ত। দাগ নম্বর ধরে ধরে মৌজা ম্যাপে খুঁজে পাওয়া যায় জমির অবস্থান।

জমির প্রত্যেক মালিকের নামে পৃথক পৃথক খতিয়ান থাকে। এক মৌজায় এক মালিকের এক বা একাধিক দাগ নিয়ে খোলা হয় একটি করে খতিয়ান। জরিপের সময় খতিয়ান তৈরি হয় নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে। তবে ১ নম্বর খতিয়ান জেলা প্রশাসকের নামে খোলা হয়। সরকারের মালিকানাধীন সব খাসজমির সমাহার ঐ খতিয়ানে। সারা দেশে সব মৌজায় যত খাসজমি, সবই এক নম্বর খতিয়ানে। সরকারের বা সরকারি প্রতিষ্ঠাসমূহের যেমন—জেলা পরিষদ, বন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ, রেলওয়ে—এরকম ডজন ডজন প্রতিষ্ঠানের নামে যেসব জমি, তা ২, ৩, ৪, ৫—এরকম খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। সরকারি খতিয়ান শেষ হওয়ার পর শুরু হয় জনসাধারণের ব্যক্তি নামে জমির খতিয়ান। একই মালিকের সব দাগ নিয়ে যেমন একটি খতিয়ান হতে পারে, তেমনি আবার দাগে দাগে আলাদা খতিয়ানও হতে পারে। তবে প্রত্যেক মালিকের খতিয়ান আলাদা আলাদা। এই খতিয়ান নম্বরও অনন্য।

যুগ যুগ ধরে কাগজ-কলমের তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে সম্প্রতি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল হয়েছে। প্রত্যাশা এই যে ডিজিটাল হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ কমবে। দুর্নীতি রোধ হবে। জমি নিয়ে মানুষের ঝুটঝামেলা কমবে, মানুষ স্বস্তিতে থাকবে।

সরকারি এক প্রতিষ্ঠানের খতিয়ানে থাকা জমিতে তাদেরই তৈরি ও তাদের দ্বারা বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটের মালিকানা বর্তানোতে নামজারি করাতে হলো। নামজারির জন্য যত কেচ্ছা তৈরি হয়েছে তা সাতকাহনের সমান। শুনতে পাঠকের ধৈর্যে কুলোবে না। তাই সে কেচ্ছা না হয় তোলা থাকুক। কথা বলি দাগ আর খতিয়ান নিয়ে।

যে জমিতে আমাদের ফ্ল্যাট, সেই জমির দাগ নম্বর মনে করুন ৭২৬। সেই দাগে নির্মিত হয়েছে একই ছাদের নিচে দুটি দালান, ১ নম্বর ভবন ও ২ নম্বর ভবন। ১৩ তলাবিশিষ্ট এই দালানের মোট ফ্ল্যাট ১৮২টি। প্রতি তলায় ১৪টি করে ফ্ল্যাট।

নানান ঘোরাঘুরি, নানান ছোট-বড়-মাঝারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে নানান দিনে নানান শুনানির পরে হাতে যখন খতিয়ান পেলাম, তখন দেখি আমার ফ্ল্যাটের দাগ নম্বর ২/৬। আমার বিদ্যাবুদ্ধিতে বুঝি, ৭২৬ দাগই আমার নামে দাগ হবে। আমি ৭২৬-এর অংশ পেয়েছি, সে যত ক্ষুদ্রাংশই হোক। দাগ নম্বর দেওয়ার এক্তিয়ার কেবল জরিপ অধিদপ্তরের। সহকারী কমিশনার ভূমি বা তার ওপর নিচের কোনো কর্তাই দাগ নম্বর সৃজন করতে পারেন না। তিনি পারেন ৭২৬ অংশ লিখতে। শোনা গেল, সফটওয়ারটিতে দাগের বিপরীতে অক্ষর লেখার কোনো সুযোগ নাই। তাই প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অংশ না লিখে ভূমি কর্তারা চাইছেন প্রত্যেকের পৃথক দাগ নম্বর দিতে। ফ্ল্যাটের দাগ নম্বর যদি সর্বশেষ জরিপের মূল দাগ নম্বরের পর অবলিক (/) চিহ্ন দিয়ে  ১, ২, ৩ করে হতো, তাহলে দাগ নম্বর অবশ্যই অনন্য হতে পারত। আমাদের ১৮২ জনের প্রত্যেকের বিপরীতে ৭২৬/১, ৭২৬/২ এমন করে ৭২৬/১৮২ পর্যন্ত হতে পারে। সেটা প্রত্যেকের অনন্য নম্বরই হতো। কিন্তু করা হলো ২/৬।

ভূমি অফিসের মতে, দাগ নম্বর ২/৬-এর অর্থ নাকি হচ্ছে ২ নম্বর ভবনের ৬ নম্বর ফ্ল্যাট। অথচ আমাদের ২ নম্বর ভবনে ৬ নম্বর ফ্ল্যাট আছে আটটি—জি, এইচ, আই, জে, কে, এল, এম, এন বর্ণ সহযোগে। এখন অনলাইনে এই আটটি ফ্ল্যাটের আটজন মালিকের একই দাগ নম্বর। সে না হয় নিজেদের মধ্যে, তাই মেনে নিলাম। কিন্তু যখন এই একই মৌজায় অন্য ভবনের ফ্ল্যাটও ২/৬ বলে দাগায়িত হবে, তখন তো পুরোই হযবরল। ২/৬ নম্বর দাগ মৌজা ম্যাপে খুঁজে পাব কী করে? মৌজা ম্যাপে যে ২ নম্বর দাগ আছে, তাতে আমার ফ্ল্যাটের দাগ খুঁজতে গিয়ে বিপদে পড়ব নাকি?

এরপর আসি খতিয়ানে। আমার খতিয়ান নম্বর ‘০’। ভূমি অফিসের বিজ্ঞজনেরা বললেন, নববিধানে সব ফ্ল্যাটেরই খতিয়ান নম্বর ‘০’। বুঝলাম খাসজমির খতিয়ান ১, তেমনি বোধহয় ফ্ল্যাটের খতিয়ান ‘০’। খতিয়ান ১-এর মালিক সরকার, একটিই সত্তা। কিন্তু ‘০’ খতিয়ানের মালিক তো একটি সত্তা নয়, অনেক মানুষের খতিয়ানই ‘০’। পৃথিবীতে কোনো ধারাক্রমে নম্বর হিসেবে ‘০’ দেওয়ার নজির সম্ভবত আমরাই তৈরি করলাম। সে জন্য আর্যভট্ট মহাশয় কিঞ্চিত্ পুলকিত হলেও হতে পারেন। তিনি ‘০’ উদ্ভাবন না করলে রোমান পদ্ধতিতে একটি ধারাক্রমই পড়ত। অতএব, জয়তু আর্যভট্ট!

আমার সমস্যা হলো আমার মৌজায় ‘০’ খতিয়ানে ২/৬ দাগ বললে শুধু আমার ফ্ল্যাট নয়, শুধু আমাদের দালানের ২ নম্বর ভবনের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটসমূহ নয়, এই মৌজার আরো কোনো দালানের একাধিক ভবন থাকলে সেই সব দালানের ২ নম্বর ভবনের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটসমূহও বুঝতে হবে। সব ফ্ল্যাটের খতিয়ান ‘০’ হওয়ার ফলে একই ‘০’ খতিয়ানে ফ্ল্যাটের সংখ্যা হয়ে যেতে পারে হাজার হাজার। তদ্রূপ ‘০’ খতিয়ানে একই দাগ নম্বর ২/৬ বা অনুরূপ কোনো দাগ শত শত না হলেও কয়েক ডজন হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। অর্থাত্, কয়েক শতাব্দী ধরে সনাতন পদ্ধতিতে চলে আসা অনন্য দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর একালের অত্যাধুনিক ডিজিটাল যুগে এসে স্বকীয়তা হারাল।

ফ্ল্যাটের জন্য খতিয়ান নম্বর মূল খতিয়ানের পর অংশ দিয়ে হতে পারত। যেমন আমাদের ফ্ল্যাটটির জমি যদি ৮ নম্বর খতিয়ানে হয়ে থাকে, তাহলে ফ্ল্যাটের খতিয়ান ৮/১, ৮/২ এমনটি করে ঐ মৌজায় ৮-এর পরে অবলিক দিয়ে হাজার বা লক্ষাধিক খতিয়ান তৈরি হলেই বা ক্ষতি কী! তাতে যদি রাষ্ট্র কখনো ঐ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৮ নম্বর খতিয়ানের জমির হিসাব খুঁজতে চায়, তাহলে এক নিমেষেই বেরিয়ে আসত সব তথ্য। কিংবা হতে পারত সর্বশেষ খতিয়ান নম্বরের পরের ধারাবাহিক নম্বর। কিংবা যদি মনেই করেন জমি আর ফ্ল্যাটের খতিয়ান ভিন্ন রকম হবে, তাহলে ১০০০১ বা ১০০০০১ হতে শুরু করলেও প্রত্যেকের খতিয়ান পৃথক পৃথক হতে পারত। অথবা ‘০’-এর ওপর মোহাবিষ্ট হলে ০/১, ০/২, ০/৩ দিয়েও হতে পারত।

ডিজিটালাইজেশনের নামে ভূমি ব্যবস্থাপনায় যে জগাখিচুড়ি তৈরি হচ্ছে, তাতে ফ্ল্যাটের মালিক মৌজা ম্যাপে নিজের ফ্ল্যাটের অবস্থান নিরূপণ করতে পারবেন না। একই ‘০’ খতিয়ান নম্বরে হাজার হাজার পৃথক ব্যক্তি পৃথক সত্তার ফ্ল্যাট অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রামের দায় রহিমকে বহন করতে হতে পারে, রহিমের দায় রামকে। মানুষের ভোগান্তি বাড়বে, মামলায় মামলায় আদালতসমূহ হিমশিম খাবে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি করা অনলাইন ব্যবস্থা রসাতলে যাবে। নারদ যেমন গ্রামগঞ্জে কাজিয়া বাধানোর জন্য খুঁটিতে গুড় লাগিয়ে কাজ সারে, ভবিষ্যতে খুঁটিতে গুড়ের মতো আমাদের ললাটের ‘০’ তেমনি করে কাজিয়া বাধার মওকা করে দেবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

ইত্তেফাক/এমএএম