জনগণই নেতা পছন্দ করেন

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৩, ০৮:১৫

ফরাসি দার্শনিক, লেখক, আইনজীবী ও কূটনীতিবিদ জোসেফ দ্য মায়েস্তর (১৭৫৩-১৮২১) ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) অন্যতম সাক্ষী। তাহার একটি উক্তি প্রবাদবাক্যে পরিণত হইয়াছে বিশ্বব্যাপী। তিনি বলিয়াছেন, ‘ইন আ ডেমোক্রেসি পিপল গেট দ্য লিডারস দে ডিজার্ভ’। ইহার সহজ অর্থ দাঁড়ায়—যেমন জনগণ, তেমন তাহাদের নেতা। এই কথা বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের জন্য খুবই প্রযোজ্য ও তাৎপর্যময়।

এই সকল দেশে চোর-বাটপাড়, বদমাইশ, দুর্নীতিবাজ, এমনকি দাগি অপরাধীরা পর্যন্ত অনেক সময় নেতা হইয়া যান। ইহা কি ভাবা যায়? ইহা কতটা দুঃখ ও লজ্জাজনক, তাহা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। কেন এমন ঘটনা ঘটে? কেননা আমরা দেখিতে পাই, এই সকল দেশে নেতা হইয়া যাইবার পর সাত খুন মাফ হইয়া যায়। ক্ষমতায় থাকিতে তাহারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। সুশিক্ষা, আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ইত্যাদির বালাই নাই বলিয়া যাহারা নেতা হইবার অযোগ্য, তাহারাও নেতা হইয়া যান। এই সকল দেশের সমাজব্যবস্থার মূলেই রহিয়াছে ত্রুটিবিচ্যুতি। চিন্তাভাবনায় রহিয়াছে বৈকল্য।

যে সমাজে দুর্নীতিবাজদের কদর মেলে, সেই সমাজের নেতারা দুর্নীতিবাজ হইবেন না কেন? চোখের সম্মুখে ও দিনে-দুপুরে পুকুর চুরি হইতে দেখিয়াও যাহারা প্রতিবাদমুখর হন না, তাহারা সেই দেশে ভালো নেতার জন্ম হইবার আশা করেন কীভাবে? ইহা ছাড়া যেই সকল দেশের জনগণ নিজেদের ট্যাক্সপেয়ার না ভাবিয়া প্রজা ভাবেন, সেইখানে স্বৈরাচারী ও রাজাসুলভ নেতার জন্ম হইবে, ইহাই কি স্বাভাবিক নহে? তাহারা এমনকি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে নিজেদের মনে করিতে পারেন না। ইহার রক্ষণাবেক্ষণে যেমন উদাসীন, তেমনি রক্ষক নামক ভক্ষকদের পাকড়াও করিবার ব্যাপারে ভীরু ও দ্বিধাচিত্ত। এই জন্য ক্ষমতা হইতে অপসারণের পরপরই এই সকল দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠিতে থাকে। কিন্তু নূতন করিয়া যাহারা ক্ষমতায় আসেন, তাহারা আগের চাইতে কয়েক গুণ বেশি উত্সাহ ও উত্সবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হন। জনগণ তখন অনন্যোপায় হইয়া আবার আগের নেতাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। কিছুদিন না যাইতেই দেখা যায়, দুর্নীতির মামলা হইতে তাহারা বেকসুর খালাস পাইতে থাকেন। এই সকল দেশে সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলি কেন শক্তিশালী হইতে পারে না, তাহার মূলেও রহিয়াছে ঐ উপরিউক্ত প্রবাদ বাক্য।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে মনে করেন, যেই দেশে যেই নিয়ম তাহা মানিয়া চলাই বাঞ্ছনীয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের মধ্যেই অনেকে অ্যাডজাস্ট করিয়া বসবাস করিতে চান। এইভাবে এই সকল দেশের ভাগ্য কখনো পরিবর্তন হয় না। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতিতে মৌলিক গলদ থাকায় সাময়িক সময়ের জন্য উন্নতি হইলেও সেই সকল দেশের মানুষ আবার গ্যাড়াকলে নিপতিত হন। সংঘাত, সংঘর্ষ, অনৈক্য ইত্যাদি তাহাদের ললাট লিখনে পরিণত হয়। এই সকল দেশের জনগণ মনেপ্রাণে ইচ্ছা না করিলে এবং শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও রাজনৈতিক সচেতনতার স্তরে উন্নত না হওয়া পর্যন্ত কোনো মৌলিক পরিবর্তনই সম্ভব নহে। রাজনৈতিক সচেতনতার প্রধান স্তম্ভ হইল ভোটাধিকারকে পবিত্র আমানত হিসাবে বিবেচনা করা এবং অর্থকড়িসহ কোনো কিছুতেই প্রভাবান্বিত না হওয়া বা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় না দেওয়া। তবে কখনো কখনো উপরিউক্ত প্রবাদ বাক্যটিকে ঘুরাইয়া দেওয়া যাইতে পারে যদি সেই সকল দেশের জনগণ সৌভাগ্যক্রমে কোনো ক্যারিশম্যাটিক ও দেশ্রপ্রেমিক নেতার সন্ধান পাইয়া যান। তখন ঐ বাক্যটি দাঁড়াইবে: লিডারস গেট দ্য পিপল দে ডিজার্ভ। অর্থাৎ যেমন নেতা, তেমন তাহার জনগণ। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সেই স্বপ্নচারী ও দেশপ্রেমিক নেতার বিকাশ লাভের কি কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট রহিয়াছে?

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন