গণতন্ত্রের রোগ নিরাময় ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন জরুরি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৩, ০৭:০০

গণতন্ত্র কী? গণতন্ত্র কাহাকে বলে? তৃতীয় বিশ্বের অনেক সাধারণ নাগরিক গণতন্ত্র বলিতে শুধু ‘ভোট’ দেওয়া বুঝেন। আবার সেই ‘ভোট’ দেওয়াটাও এইসকল জনপদে নানানভাবে ম্যান্যুপুলেট করা হয়। যদিও বর্তমানে গণতন্ত্রকে বলা হইয়া থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। কী করিয়া শুরু হইল এই শাসনব্যবস্থা?

ব্রিটানিকায় দেওয়া তথ্য মতে, প্রাচীন গ্রিকের এথেন্স শহরে প্রথম গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত দেখা যায়—যেইখানে প্রায় হাজার নাগরিকের একটি অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে সকল সিদ্ধান্ত নেওয়া হইত। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথমদিককার অঙ্গরাজ্যগুলিও এই ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা টমাস জেফারসনের ‘অন ডেমোক্রেসি’ বইটি হইতে জানা যায়: ১৭৮৯ সালে জেফারসন লিখিয়াছিলেন, ‘কতগুলি অধিকার রহিয়াছে যাহা সরকারের নিকট সমর্পণ করা নিষ্প্রয়োজন, অথচ ঠিক সেইগুলিরই ওপর হস্তক্ষেপ করিতে সকল দেশে সকল ধরনের সরকারকে সর্বদা ব্যস্ত থাকিতে দেখা গিয়াছে। এই অধিকারগুলি হইতেছে চিন্তার অধিকার, ভাবপ্রকাশের অধিকার, অবাধ বাণিজ্যের অধিকার ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার।’ জেফারসন যখন ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন ফরাসিরা তাহাদের সম্রাটের মস্তকছেদ করিতেছে, জেফারসন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট তখন নেপোলিয়ন যুদ্ধের পর যুদ্ধ জয় করিয়া ইউরোপের একচ্ছত্র নায়ক হইবার পথ প্রস্তুত করিতেছেন। জেফারসন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন নেপোলিয়নের স্থলবাহিনী দেশের পর দেশ পদদলিত করিতেছে এবং ইংরেজদের নৌ-বাহিনী সমুদ্রে ধ্বংসের কাজ চালাইতেছ। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সরকারি পদে থাকাকালীন জেফারসন দেখিয়াছেন—পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নাই। এজন্য তিনি চাহিয়াছিলেন—গণতন্ত্র কায়েম হউক সারা বিশ্বে। ইহার পূর্বে ১৬৮৯ সালে, ইংল্যান্ডের রাজা-রানি উভয়েই অধিকার-বিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করিলেন, যাহা পরিচিতি হইল—‘বিল অফ রাইটস’ নামে। এই দলিল কয়েকটি সাংবিধানিক নীতিকে স্বীকৃতি দিল, যাহার মধ্যে ছিল নিয়মিত সংসদ বসানোর অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচনের অধিকার, এবং সংসদে মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার। ক্রমশ প্রজাতন্ত্র তথা গণতন্ত্রের পথে হাঁটিল ইংল্যান্ড। ইহার পর সুইজারল্যান্ড এবং অনেক মার্কিন অঙ্গরাজ্য ১৯ শতকে তাহাদের সংবিধানে গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করিল। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ‘ব্রিটিশ ভারতে’ ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন রচিত হয়—যেইখানে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা প্রথম বলা হয়। অতঃপর ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক আইন পরিষদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইহার পর ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হইল। ১৯৫০ সালে ভারত নিজেকে প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে, যাহার মূল কথা হইল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অন্যদিকে পাকিস্তানে গণতন্ত্র এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারংবার হোঁচট খাইয়াছে।

ইহা সকলেই জানেন, গণতন্ত্রে ভোট ও সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু অনেক দেশে পরিপূর্ণ বেসামরিক সরকার থাকিলেও সেইখানে গণতন্ত্র কতটা কার্যকরী—তাহা বুঝিতে রকেট সায়েন্টিস্ট হইতে হয় না। শরীরে রোগের উপসর্গ দেখিয়া যেমন রোগ বুঝা যায়, তেমনি গণতন্ত্রের রোগাক্রান্ত হইবার বিষয়টি বুঝা যায় কতিপয় উপসর্গের মাধ্যমে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে—প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, ভোটার অংশগ্রহণে অনাগ্রহ, মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া, ক্ষমতা হারানোর ভয় প্রভৃতি। আমরা দেখিতে পাইতেছি, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশেই সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাইবার সাহস থাকে না। দুর্নীতি, অনিয়ম, অরাজকতা, পরাজিতদের ঘরবাড়ি-ব্যবসাবাণিজ্যে ভয়াবহ হামলা-মামলা-নৃশংসতাসহ যত ধরনের খারাপ দৃষ্টান্ত থাকিতে পারে, তাহা দিন দিন আরও বীভত্সরূপে দেখা দিতেছে এইসকল দেশে।

কিন্তু এইভাবে আর কতদিন? সকল কিছুরই এক ধরনের ইলাস্টিসিটি থাকে—বেশি টানিলে উহা ছিড়িয়া পড়িতে বাধ্য। সুতরাং এই রোগাক্রান্ত গণতন্ত্রের রোগ যদি সারানো না যায়—তাহা হইলে একটি সময় আসিয়া নিশ্চিতরূপেই নৈরাজ্য দেখা দিবে। এখন যাহা ঘটিতেছে, যেইভাবে আস্থাহীনতা ও বিশ্বাসহীনতার সিলসিলা চলিতেছে—এইভাবে চলিতে থাকিলে তাহা একটি সময় আসিয়া প্রবল ঝড় সৃষ্টি করিবে, জন্ম দিবে নূতন বিপ্লবের। সুতরাং সময় থাকিতে গণতন্ত্রের রোগ নিরাময় করিয়া বিশ্বাস ও আস্থার পুনর্বহাল অত্যন্ত জরুরি। ইহার বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন