২৪ জুন সকালে পুতিন জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে সুস্পষ্ট ভাষায় ‘বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ ও দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যে তাড়িত’ ‘বিদ্রোহের যোগসাজশকারীদের’ নিন্দা করেন, কিন্তু কারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের নামধাম উল্লেখ করেননি। এমনকি ‘প্রিগোশিন ওরফে প্রিগো’র নামও উচ্চারণ করেননি। ভাগনার গ্রুপের অধিকাংশ সেনা ও কমান্ডারের কাউকেই ষড়যন্ত্রকারীদের দলভুক্ত করেননি। পুতিন বরং দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘তারাও রুশ দেশপ্রেমিক, তারা রুশ জনগণের ও দেশের প্রতি অনুগত’। তবে ‘রাশিয়ার শত্রুদের কিয়েভের নিয়োনািস, সম্মিলিত পশ্চিমের পৃষ্ঠপোষকের দল ও অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের’ প্রতি অকরুণ ভাষায় পুতিন বলেন, ‘ক্যু সফল হলে তাদের খুব সুবিধা হতো’; কিন্তু ‘তারা ভুল হিসাব করেছে’ (অর্থাত্ আগাম ‘হিসাব’ করেছে)। এসব বলার পেছনে পুতিনের মনে কিছু ছিল নিশ্চয়!
যা হোক, ২৬ জুনের ‘দ্য গ্রে জোন’ (The GrayZone) লেকে যে মোটামুটি ১২ ঘণ্টার সামান্য কিছু বেশি সময় ধরে, সাবেক রাষ্ট্রদূত ম্যাকফল থেকে শুরু করে জেলেনস্কি, নিয়োকন পণ্ডিত, অ্যান অ্যাপ্ল্বমরা (যেমন :‘টাইম ইজ নট অন রাশা’স সাইড আফটার অল’), ‘গৃহযুদ্ধ’ লেগে গেল আর কি পটভূমিকা এবং আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ‘রুশরা রুশদের হত্যা করছে’, সেই সঙ্গে ‘বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি’ এবং পুতিন ‘সম্ভবত কোথাও লুকিয়ে আছেন’—এসব আলোচনার তপ্ত উত্তেজনায় ফেটে পড়েন তারা।
আসন্ন রক্তস্নান ও আকস্মিক রাজনৈতিক তোলপাড় ঘটার প্রত্যাশায়, সিএনএনের মতো করপোরেট নেটওয়ার্কগুলো ‘যে ক্যু ঘটেনি’ নিয়ে মহাসমারোহে পরিপৃক্ত কভারেজে নেমে পড়ে, ভাড়া করে আনা জেনারেল, থিং ট্যাংক পাড়ার (কে স্ট্রিট) থিংক ট্যাংকার এবং যুদ্ধবাজ মাঝারি মানের সাবেক কূটনীতিকে কেব্ল-নিউজের ‘গ্রিনরুম’ ভর্তি হয়ে যায়।
শনিবার অপরাহ্নে অবশ্য সারা যুক্তরাষ্ট্রে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে প্রিগোশিন প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে চুক্তিতে আসেন এবং প্রতিবাদের সমাপ্তি টেনে আজ রাতের মধ্যে নির্বাসনে চলে যাচ্ছেন। এভাবে প্রায় রক্তপাতহীন বিষয়টির সমাপ্তি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা ছিল ৬ জানুয়ারির ‘ক্যাপিটল রায়টের’ চেয়ে কম।
অভ্যুত্থানের পশ্চাতে পশ্চিমের স্পেশাল সার্ভিসেসের অনুপ্রেরণা নাকি হামবড়া প্রিগোর ফোলানো স্ফীত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অথবা দুইয়ের সংমিশ্রণ ইন্ধনের কাজ করেছে কি? রুশ ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান জেনারেল ভিক্টর জলোতভ ‘নিশ্চিত’ যে তা-ই হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ১৮ ঘণ্টা পূর্তির আগেই অভ্যুত্থান একেবারে মিইয়ে যায়, ভোজবাজির মতো উবে যায়। মস্কো থেকে এক-দেড় শ কিলোমিটার দূরে ‘ভাগনারের’ (Wagner) জোয়ানরা থেমে যায়।
প্রিগোর ‘বিদ্রোহের’ প্রতি রাজনৈতিক শ্রেণি বা সামরিক বাহিনীর মধ্য থেকে কোনো সমর্থন আসেনি। প্রতিরক্ষা লাইন বরাবর রুশ সামরিক কর্মকাণ্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল। প্রিগোর বিদ্রোহসুলভ নাটকীয়তার সঙ্গে আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, এর সূচনা হয় ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এবং ওকে নিবৃত্ত করার কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখিনি। প্রিগো ছিলেন ভাগনার দলের প্রধান, তার কোনো সামরিক ট্রেনিং নেই বটে, তবে ‘মাস্টার অব সেরিমনিজ’ হিসেবে তিনি তুলনাহীন।
সোমবার (জুন ২৬) প্রিগো প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে এই ক্ষণস্থায়ী বিদ্রোহের মাধ্যমে রুশ সরকার উচ্ছেদের কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না, তার উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ পরিচালনায় অযোগ্যতার বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ’ ব্যক্ত করা।
অবশ্য সম্মিলিত পশ্চিম প্রিগোর ‘বিদ্রোহ বা মিউটিনি’কে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নেয়; মূলধারার মিডিয়ার ক্ষিপ্রতা থেকে স্পষ্ট যে রাশিয়ায় ‘তোলপাড়’ ঘটতে যাচ্ছে, সম্বন্ধে আগাম ব্রিফিং তারা পেয়েছিল। এবং কিয়েভ বলে যে ব্রিটিশ ও মার্কিন কর্মকর্তাদের তরফ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের ‘অস্ত্র সংবরণের’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
নিউ ইর্য়ক টাইমস লেখে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন বুধবারই (অর্থাত্ ২১ জুন) ‘গ্যাং অব এইট’কে আসন্ন ‘বিদ্রোহের’ ব্রিফিং দেন (কংগ্রেসীয় আট লিডারকে নিয়ে গঠিত নির্বাহী শাখা, ‘গ্যাং অব এইট’ নামে পরিচিত; নির্বাহী শাখাকে ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’তে টপ-মোস্ট ওরফে ‘কভার্ট’ ইনটেলিজেন্সের ব্রিফিং দেওয়া হয়)। তবে বিদ্রোহ-উত্তর হোয়াইট হাউজ চরকায় সুতা কাটার মতো বিরামহীন বলতে থাকে যে ‘পশ্চিমের কর্মকর্তারা’ তো ‘বিস্মিত, বিহবলিত’। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন শুক্রবার (২৩ জুন) রাতে বিশ্বব্যাপী কর্মকর্তাদের আর্জেন্ট কেব্ল পাঠিয়ে প্রিগোর ‘বদ্রোহ’ নিয়ে টুঁ শব্দটি না করার নির্দেশ দেন। স্পষ্টত, কেউই প্রিগোর প্রতারণা তথা ‘মাস্কিরোভকা’ (maskirovka) ধরতে পারেনি।
প্রিগোর ‘বিদ্রোহ’ নামক সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির সত্যিকারের বিজয়ী হলো জনগণ এবং তাদের মতামত। সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মস্কোবাসিকে সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে পড়ার বুদ্ধি দেওয়া হয়। কিন্তু রুশরা তা করে না। তারা বরং একই সঙ্গে পুতিনকে, রুশ সেনাবাহিনিকে, ভাগনারকে এবং প্রিগোকে সমর্থন করে; কমিউনিস্টরা পর্যন্ত শরিক হয়। সাধারণভাবে রুশরা ভাগনার ও রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে বিশেষ স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে; তারা তাদের হিরোদের জন্য গর্বিত, অহংকারী জাতি। তারা সচেতন যে প্রতিটি রণাঙ্গনের সাফল্যের পেছনে ‘আইএসআর’ (ইনটেলিজেন্স, সারভিল্যান্স, রিকনেসন্স), ‘সিএএস’ (ক্লোউজ এয়ার সাপোর্ট) তো বটেই, ‘ভিডিভি’ বা রাশান এয়ারবোবোর্ন ফোর্সেসের একাধিক ইউনিটের সাপোর্ট নিয়োজিত রয়েছে। ‘রস্তভ অন ডনে’ও তাই হতে দেখেছি আমরা। পশ্চিমের মিডিয়া ও তাদের ‘বিশেষজ্ঞরা’ প্রিগোর গুরুত্বপূর্ণ রুশ শহর রস্তভ ‘ক্যাপচারের’ উদাহরণ দিয়ে ‘রাশিয়া বদলে গেছে’ প্রমাণের চেষ্টা করেন। বাস্তবে প্রিগো রস্তভের সামরিক হেডকোয়ার্টারে ঢোকেন, জেনারেল সুরোভিকিন ওরফে জেনারেল আর্মাগেডন (সিরিয়া ফ্রন্টে অর্জিত ‘খ্যাতি’) সুপ্রভাত জানান। (বর্তমানে, সুরোভিকিনের পরিচয় হলো, যেমন :বাখমুত/আর্তেমিয়োভস্কের ‘মিট গ্রাইন্ডার’ বিপর্যয়ের সংগঠক; কিয়েভের ‘কাউন্টার অফেন্সিভের’ সমাধিস্থল নামে পরিচিত তিন সারির/ স্তরের ডিফেন্স, রণাঙ্গনে ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের অসাধারণ ব্যবহার ইত্যাদি)। হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত অন্য জেনারেলদের সঙ্গে ব্যালকনিতে প্রিগোর খোশগল্প করার ফিল্ম তোলা হয়, অনলাইনে অনেক ভিডিও রয়েছে। সেখানে জনসাধারণের উদ্বেগহীন হাঁটাহাঁটি লক্ষণীয়। যা হোক, পশ্চিমের মিডিয়া ‘বিশেষজ্ঞরা’ সত্য বলেননি।
নতুন মেনেজমেন্টের অধীনে রিব্র্যান্ডেড ভাগনার ‘মিনস্ক’ (বেলোরাশা) থেকে রুশ ফেডারেশনসহ আফ্রিকায় তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে য়াবে।
সম্মিলিত পশ্চিম প্রিগোর অভ্যুত্থানকে খুব সিরিয়াসলি নেয়। কারণ কী? খতিয়ান নেওয়া যাক তবে। ‘স্যাংকশনস ফ্রম হেল’ তথা ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ব্যর্থ হয়; মস্কো-বেইজিং সম্পর্কের মাঝখানে একটি গোঁজ বসানো, সেটিও ব্যর্থ হয়; অতঃপর, অবশিষ্ট বিশ্বের, ছোট-বড়-মাঝারি— কোনো সাইজের দেশকে দিয়েই রুশবিরোধী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করানো যায়নি; ‘ব্রিকস’কে বাগে আনার প্রচেষ্টাও অতিবিলম্বিত প্রয়াস বলে প্রমাণিত হয়; সর্বশেষ কিয়েভের ‘কাউন্টার অফেন্সিভ’ প্রচেষ্টায় রুশ ডিফেন্সিভ লাইনে মাছি ঢোকার মতো ছিদ্রও করা যায়নি, বরং ‘অত্যাশ্চর্য ‘ভুন্ডের ভাফেন’(Wunderwaffen) অস্ত্রশস্ত্রগুলো (লিয়োপার্ড, ব্র্যাডলি, মাইন ক্লিয়ারিং ভ্যাহিকেল, প্যাট্রিয়ট...) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। গোঁদের উপর বিষফোড়ের মতো অপেক্ষা করছে আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকসের সামিটে—বাণিজ্য লেনদেনে পেমেন্ট কারেন্সি/মুদ্রাসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
প্রিগোর অভুত্থান কি শেষ খড়কুটো ছিল না! রাশিয়ায় কোনো রকমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা গেলে...।
যা হোক, পরবর্তী ঘটনাবলি কীভাবে বিকশিত হয় দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে!
লেখক: ইউরোপপ্রবাসী লেখক
