সড়ক দুর্ঘটনায় কেন বাড়িতেছে মৃত্যুর মিছিল

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ০৬:৩০

ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের রাস্তাঘাট যথেষ্ট প্রশস্ত ও উন্নত। সেইখানকার ট্রাফিক-ব্যবস্থা লইয়াও কাহারো কোনো প্রশ্ন নাই। ইহার সহিত সেই সকল দেশের নাগরিকগণ ট্রাফিক আইন ও নিয়মকানুন মানিয়া চলিতে অভ্যস্ত। ইহার মধ্যেও সেই সকল দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে, কম আর বেশি; কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নানা অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনা, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, রোড ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইন-সিম্বলের অভাব, তৃণমূল এলাকা পর্যন্ত ফুটপাতসহ অবকাঠামোগত নানা দৈন্য, যথাসময়ে রাস্তা সংস্কারে সরকারের উদাসীনতা, ট্রাফিক আইন মানিয়া চলিবার প্রতি নাগরিকদের অনীহা, গাড়িচালকদের বেপরোয়া মনোভাব, যাত্রী সাধারণ ও পথচারীদের অসচেতনতা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বাংলাদেশও তাহার ব্যতিক্রম নহে।

শুধু বাংলাদেশ নহে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও এশিয়ার উদীয়মান বৃহত শক্তি চীনেও প্রায়শ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। তবে বাংলাদেশে ইদানীংকালে ইহা একটি মহামারি আকার ধারণ করিয়া বসিয়াছে। সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহাকে অনেকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সহিত তুলনা করিয়া থাকেন। এইখানে এইভাবে প্রতিদিন খালি হইতেছে কোনো না কোনো মায়ের বুক। এই বছর ঈদুল আজহার ছুটিতে সমগ্র দেশে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে এবং ইহাতে নিহত হইয়াছেন ২৯৯ জন,  আহত হইয়াছেন পাঁচ শতাধিক। এইভাবে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়িয়া চলিয়াছে।

ইহারই ধারাবাহিকতায়, গত শনিবার চালকের অবহেলা ও অমনোযোগিতার কারণে ভাণ্ডারিয়া হইতে পিরোজপুরগামী ‘বাশার স্মৃতি’ বাসটি ঝালকাঠি উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন পুকুরে নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া পড়িয়া গেলে নিহত হয় ১৭ জন যাত্রী, আহত হয় ৩৪ জন। তাহাদের অধিকাংশই ভাণ্ডারিয়া, তেলিখালী, রাজাপুর, কাঁঠালিয়া, শিয়ালকাঠি, বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার অধিবাসী। বাসটিতে যাত্রী ছিল প্রায় ৭০ জন। আহত যাত্রীদের বক্তব্য হইল, যাত্রা শুরু হইবার পর হইতেই বাসচালক ক্রমাগত সুপারভাইজারকে আরও যাত্রী উঠানোর জন্য পীড়াপীড়ি করিতেছিল। সেই বাসটির ছাদেও যাত্রী লওয়া হইয়াছিল অবৈধভাবে। ইহার পাশাপাশি বাসটি চলন্ত অবস্থায় চালক অনবরত মোবাইল ফোনে কথা বলিয়া যাইতেছিল। অর্থাৎ বাসটি চালনায় তাহার মনোযোগ ও ধৈর্য ছিল না। চলন্ত অবস্থায় গাড়িচালকের মোবাইল ফোনে কথাবার্তা বলা যেমন, তেমনি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করাও আইনের পরিপন্থী। এইখানে স্পষ্টত বাসচালকের দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতা প্রতিভাত হইয়াছে। নিরাপদ সড়ক আইন ও ট্রাফিক নিয়মকানুনের প্রতি প্রদর্শন করা হইয়াছে বৃদ্ধাঙ্গুলি। এতগুলি প্রাণ বিসর্জনের দায়ে পলাতক এই বাসচালককে অবিলম্বে গ্রেফতার করিয়া তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা লওয়ার আহ্বান জানাই আমরা।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেই হারে বাড়িতেছে, তাহা অবশ্যই উদ্বেগজনক। প্রতিনিয়ত ঘটিতে থাকা সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিরোধে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একাধিক বার রাজপথে নামিয়া বিক্ষোভ মিছিল করিয়াছে এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে শামিল হইয়াছে। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নিরাপদ সড়ক আইন, ২০১৮ সংসদে পাশ করিয়াছে; কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, আরও অনেক আইনের মতো এই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন লইয়াও প্রশ্ন রহিয়াছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই সংক্রান্ত মামলার হারও কম। শাস্তি কম হওয়ায় মামলা দায়েরে আগ্রহ দেখা যাইতেছে না। মামলা করিয়া উপরন্তু আরেক দফা ক্ষতির মুখে পড়িতেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। তাই সড়ক দুর্ঘটনার যেই সকল কারণ রহিয়াছে এবং বিভিন্ন সময় যেই সকল সুপারিশ উপস্থাপন করা হইয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

ঝালকাঠির সড়ক দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। আমরা নিহত যাত্রীদের আত্মার প্রশান্তি কামনা করি। তাহাদের শোকসন্তপ্ত পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। ইহার পাশাপাশি আহতদের সঠিক চিকিৎসা ও তাহাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। সড়ক দুর্ঘটনাকে এখন আমরা অনেকেই ভাগ্যের লিখন হিসাবে গ্রহণ করিয়া লইয়াছি; কিন্তু কপালের লিখন তো চিরস্থায়ী নহে, দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য। অতএব, যেই পর্যন্ত চালক ও পথচারী সচেতন ও দায়িত্বশীল না হইবেন এবং এই ব্যাপারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হইবে, ততদিন অবধি সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ হইবার আশা করা যায় না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন