সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অকুতোভয় বীর সেনানি মুক্তিকামী আপামর জনসাধারণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জল-স্থল ও আকাশপথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ চালিয়েছিল। প্রাথমিক প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ফোর্সেস গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ফোর্সেসের অধীনে বিভিন্ন সেক্টর গঠিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময় বিভিন্ন প্রশিক্ষণশিবিরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফোর্সেসের প্রতিটি সেক্টরে প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলে মুক্তিযুদ্ধ কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়া যুবকদের স্বল্প সময়ের মধ্যে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয়। সেক্টরের সব বাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। বিদ্রোহী বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য এবং তত্কালীন ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও নির্বাচিত সাধারণ জনতার সমন্বয়ে গঠিত হয় নিয়মিত বাহিনী বা ‘মুক্তিবাহিনী’।
অন্যদিকে সাধারণ ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবী ও আপামর জনসাধারণকে নিয়ে গেরিলা পদ্ধতির আদলে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠন করা হয় ‘গণবাহিনী’। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সব বাহিনীকেই তাদের সদস্যদের প্রচলিত অর্থে মুক্তিবাহিনী এবং ক্ষেত্রবিশেষে মুক্তিফৌজ নামে অভিহিত করা হতো। নিয়মিত বাহিনীকে তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে গণবাহিনীর সদস্যরা সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সেক্টরে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তারা মাতৃভূমিতে প্রবেশ করেন এবং গেরিলা পদ্ধতিতে সামরিক অপারেশন চালান। তাদের মূলত ক্ষুদ্রাস্ত্র, মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
বিজয় ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা ১৫ নভেম্বর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর ওপর বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের গতি আরো বাড়িয়ে দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যৌথ বাহিনী ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর যশোরের বয়রা এলাকা থেকে তাদের অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ৪২ পদাতিক ব্রিগেডের ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, একটি কোম্পানি মুক্তিবাহিনী, একটি স্কোয়াড্রন সাঁজোয়া বাহিনীসহ কপোতাক্ষ নদ অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গরীবপুর-জাহাঙ্গীরপুর অক্ষ বরাবর প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করে। ব্রিগেড আর্টিলারিকে মোহাম্মদপুরে এবং ট্যাংকের বহরকে ভদ্রা এলাকায় রাখা হয়। এই অঞ্চলে যৌথ বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে বিচ্ছিন্নকরণ, বাইপাস, আক্রমণ ও শত্রুর পশ্চাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরির সমন্বয়ে যে রণকৌশল ব্যবহার করে, তা তাদের বিজয় ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর জন্ম ১৯৭১ সালের যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আমাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু করে। এই যৌথ বাহিনীর অভিযান ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংঘটিত সম্মিলিত বাহিনীর (মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী) অপারেশনের ভিত্তিপ্রস্তরও ছিল, যা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ে পরিণত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। মুক্তিযুদ্ধে তাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সাত সদস্যকে সর্বোচ্চ বীরত্বপূর্ণ বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হয়, ৫৮ জনকে বীর-উত্তম, ১৩৪ জনকে বীরবিক্রম এবং ১৭৮ জনকে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য একটি সামরিক একাডেমি, সম্মিলিত ট্রেনিং সেন্টার, প্রতিটি সেনা কোরের জন্য আলাদা আলাদা প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং অন্যান্য অনেক ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা বিএনএস ইসা খান উদ্বোধন করেন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য দুটি যুদ্ধজাহাজ ক্রয় করেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে একটি বহুমুখী বাহিনীতে পরিণত করার জন্য তিনি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মিগ-২১, আধুনিক পরিবহন বিমান, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হেলিকপ্টার ক্রয় করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বৈরশাসক ক্ষমতায় আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে উপেক্ষা করা হয়। তাছাড়া তথাকথিত অভ্যুত্থান ও পালটা অভ্যুত্থানে সশস্ত্র বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নিহত হন। কোর্ট মার্শালের নামে তথাকথিত বিদ্রোহের দায়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ সশস্ত্র বাহিনীর অনেক সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অনেককে চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী অভিজ্ঞ জনবল ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, অঙ্গীকার ও গতিশীল নেতৃত্বে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিল। আমাদের সামরিক বাহিনী আধুনিক সরঞ্জাম, অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে পরিপূর্ণ হয়েছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ সম্পর্কে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তবে দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগ ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে এবং এ পর্যন্ত তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে, যার ফলে ফোর্সেস গোল-২০৩০ ও ভিশন-২০৪১ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সব পরিকল্পনা, ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে থাকে। নতুন নতুন সেনানিবাস, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করা হয়।
প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী পেশাদার বাহিনী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এই তিন বাহিনীতে কাজ করা মেধাবী নারী-পুরুষদের ধন্যবাদ, তাদের শ্রম, চেতনা, দেশপ্রম ও দক্ষতা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে করে তুলেছে জাতির গর্ব। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ক্রান্তিকালে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সাহস ও দক্ষতা দেখিয়েছেন। শান্তি রক্ষার জন্য সহানুভূতি ও ত্যাগ দেখিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের বন্যা, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির মতো সময়ে আমরা তাদের ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও আমরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি ও দেখে চলেছি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড
