ঘটনাটি ঘটিয়াছে পটুয়াখালীর সদর থানায়। এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও সহকারী উপপরিদর্শক এএসআইকে মহামান্য হাইকোর্ট তলব করে। তাহাদের অপরাধ, তাহারা এক মামলায় আগাম জামিনপ্রাপ্ত আসামি কলেজশিক্ষার্থী মো. আশরাফুল হাওলাদারকে আটক করিয়াছেন। এই ঘটনায় ঐ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে ভর্ত্সনা করে হাইকোর্ট। তলবের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার তাহারা আদালতে হাজির হইলে তাহাদের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলে, ‘আপনারা কি মালিক হয়ে গেছেন? মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কেটে দেন। মিটিং শেষে আর ফোন দেননি, কোনো পদক্ষেপ নেননি।’ ইহার পর আদালত বলে, ‘দেশের মালিক জনগণ। অথচ যে যেখানে বসে, সে সেখানকার মালিক বনে যান। এজন্যই কি দেশ স্বাধীন হয়েছে? জামিনে থাকার পরও আসামিকে গ্রেফতার করে কোর্টে পাঠিয়েছেন। আদালতের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আপনাদেরও।’
যদিও ঐ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক সাসপেন্ড করা হইয়াছে, তথাপি প্রশ্ন উঠিতে পারে, তাহারা এই কাজটি করিলেন কীভাবে? কেননা কাহারো জামিন হইয়াছে কি না, তাহা আজকাল অনলাইনেই দেখা যায়। ইহার পরও কেন আসামিদের পুলিশের কাস্টডিতে নেওয়া হইবে? আমাদের পবিত্র সংবিধানের ৭-১ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ আমাদের দেশটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। এই নামটি আমাদের সংবিধানে খোদাই করিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তনীয় নহে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সরকার গঠন, সরকার পরিচালনাসহ বিচার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দেশ রক্ষা এই সকল বিভাগ পরিচালনার নীতি পদ্ধতি নির্ধারণ এবং যাবতীয় আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও দায়িত্ব জনগণের প্রতিনিধিত্বে গড়িয়া উঠা মহান জাতীয় সংসদের। সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে সংসদই সকল ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এই জন্য জনগণই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। জনগণের পক্ষে জাতীয় সংসদ এই ক্ষমতা ধারণ ও প্রয়োগ করিয়া থাকে মাত্র। এই কারণে এই সংসদ রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন (ইমপিচ) করিলে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রীকেও পদ হারাইতে হয়। এই সকল বিবেচনায় রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই; কিন্তু ইহা এক শ্রেণির সরকারি আমলা তাহা বেমালুম ভুলিয়া যান।
পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যাহারা কাজ করেন, তাহাদের আইন সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখিতে হয়। কেননা আইনের লোক হইয়া কেহ আইন ভঙ্গ করিতে পারেন না। তাহা ছাড়া ‘দেশের মালিক জনগণ’ এই কথা অতীব ব্যঞ্জনাময়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের রক্ষক মাত্র। তাহারা যদি দেশের মালিকের মতো আচরণ করেন, তাহা হইলে তাহা কাম্য হইতে পারে না। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নহে, একটি রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ তথা নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগে দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ কেহই নিজেদের দেশের মালিক ভাবিতে পারেন না; কিন্তু তাহাদের আচার-আচরণে তাহা অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না। আমরা একটি আধাসামন্তবাদী সমাজে বসবাস করায় এমন বিভ্রম ও ঔদ্ধত্য অনেকের মধ্যে তৈরি হইতে পারে; কিন্তু যেই সমাজ ও রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক, সেইখানে এইরূপ আচরণ সচরাচর দেখা যায় না।
অন্যদিকে দেশের মালিক জনগণ হইলেও সেই জনগণকেও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে নিয়মকানুন মানিয়া চলিতে হইবে। তাহা ছাড়া কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহেন। সর্বোপরি দেশের মালিক যেই হেতু দেশের জনগণ, তাই জনগণের জন্য আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত করিতে হইবে। আইনের মধ্যে থাকিয়া সরকারি আমলাদের সেবার মানসিকতা তৈরি করিতে হইবে।
