ব্লেইম গেম খেলিয়া কখনো কোনো সমস্যার সুরাহা হয় না

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৩, ০৭:৩০

মহান সৃষ্টিকর্তা কী অপূর্ব সৃষ্টি-সুষমায় এই ধরণীকে অলংকারিত করিয়াছেন! এইখানে প্রকৃতি এবং প্রাণিজগতের অপূর্ব লীলাখেলা দেখিয়া আমরা আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে শুধু এইটুকু বুঝিতে পারি—সৃষ্টিকর্তার কী অপার মহিমা! আমাদের মস্কিষ্কের ছোট্ট করোটিতে এই সৃষ্টিজগতের রহস্য ও সৌন্দর্যের শতকোটি ভাগের এক ভাগও আমরা ধারণ করিতে পারি না। এই বিশ্বজগতের আকাশমণ্ডল, পৃথিবীর ভূমি ও জলভাগের প্রাণিজগতের বিশাল বৈচিত্র্য বলিয়া দেয়, আমরা কত ক্ষুদ্র! এই ক্ষুদ্র আমরাই এই পৃথিবীর এক বিশাল পরিবর্তন সাধন করিয়াছি। পৃথিবীতে শেষ হিমযুগের অবসান হইয়াছে প্রায় ১১ হাজার ৭০০ বছর পূর্বে। তাহার পর শুরু হইয়াছে হলোসিন উপযোগ। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান পৃথিবীতে নূতন করিয়া ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ, জীবমণ্ডল গড়িয়া উঠিয়াছে গত ১১ হাজার বছর ধরিয়া। এই সেই সময়কাল যখন মানুষ কৃষি আবিষ্কার করিয়াছে, শহর-বন্দর গড়িয়া তুলিয়াছে, শিল্পবিপ্লব ঘটাইয়াছে। মূলত এই যুগেই মানুষ ‘আধুনিক’ হইয়া উঠিয়াছিল। সমস্ত ইতিহাস এই যুগের মধ্যেই সন্নিবিষ্ট।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হইল, এখন আমরা এই ‘হলোসিন’ যুগকে অজ্ঞাত ‘অ্যানথ্রোপোসিন যুগের জন্য ছাড়িয়া দিতে যাইতেছি। শুরু হইতেছে নূতন যুগ। সম্ভবত ঘোষণা আসিবে আগামী বছর। অ্যানথ্রোপোসিন এমন একটি যুগ—যাহা মানবসৃষ্ট। বৈশ্বিক জলবায়ু বিশৃঙ্খলা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের মাধ্যমেই এই যুগের সূচনা। আমরা এখন কী দেখিতে পারিতেছি? সারা বিশ্বে আবহাওয়া চরম আকার ধারণ করিতেছে। ইউরোপ এখন বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণতা-অর্জনকারী মহাদেশ। ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এখন আর কেহ অবাক হয় না। গত বছর, ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ইউরোপে দাবদাহের কারণে মারা গিয়াছে। পূর্বের স্বাভাবিক আবহাওয়া যেন হারাইয়া ফেলিতেছে এই ধরণী। এই জুন ছিল পৃথিবীতে রেকর্ড করা সবচাইতে উষ্ণ মাস। জুলাই সর্বকালের সবচাইতে উষ্ণ দিনের সঙ্গে পাল্লা দিতেছে। আমরা উষ্ণতম দিনের রেকর্ড প্রতিনিয়তই ভাঙিতেছি। বলা হয়, ১ লাখ ২০ হাজার বছরের পুরোনো তাপমাত্রার রেকর্ড দিনের পর দিন ভাঙিয়া দিতেছি আমরা। ইহা যেন এক নতুন পৃথিবী!

বর্তমানে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করিবার বিষয়টিকে এই ধরিত্রীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সহিত তুলনা করা হইতেছে। প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে শুরু হওয়া শিল্পায়নের পর হইতে এখন অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়াছে। বিশ্বের উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়িতেছে। গত শতকের তুলনায় উচ্চতা বৃদ্ধির হার এখন দ্বিগুণেরও বেশি। ইহার ভুক্তভোগী সারা বিশ্বই। জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক আন্তসরকার সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) একটা গবেষণা বলিতেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার (৩৯.৩৭ ইঞ্চি) বাড়িলে বাংলাদেশের ১৭-২০ শতাংশ স্থলভূমি পানিতে তলাইয়া যাইবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এখন দুর্যোগ বেশি হইতেছে, নদীভাঙন বাড়িতেছে, বেশি বেশি ঝড়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হইতেছে। সেই সঙ্গে উত্তরবঙ্গে তৈরি হইতেছে মরুশুষ্কতা এবং দক্ষিণবঙ্গে বাড়িতেছে লবণাক্ততা।

কিন্তু এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য শিল্পোন্নত দেশসমূহ অধিক কার্বন নিঃসারণ করিলেও বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির দায় খুবই সামান্যই। কিন্তু ভোগান্তি অনেক বেশি। এই কারণেই সংকট মোকাবিলায় তহবিল বরাদ্দ ও তাহার ব্যয়ের উপর জোর দিতেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহ। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নামে নূতন তহবিল লইয়া এই বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত। কিন্তু এই ব্যাপারে কাহাকে দোষারোপ করিবার কোনো সুযোগ নাই। ব্লেইম গেম খেলিয়া কখনো কোনো সমস্যার সুরাহা হয় না। অর্থের প্রয়োজন বটে, তাহা স্বীকারও করা হয়, শিল্পোন্নত দেশগুলি আশ্বাসও দেয়। কিন্তু অর্থ এত সহজে কখনো মিলে না। সুতরাং এই সমস্যা সমাধানে ঐকমত্য প্রয়োজন। সংকটকালে মাথা ঠাণ্ডা রাখিতে হয়। আমাদের তো একটাই পৃথিবী। পৃথিবীর রক্ষার মহাদায়িত্ব সকলেরই। মহান সৃষ্টিকর্তার এই অপূর্ব সৃষ্টিজগেক আমরা তাহার সৃষ্টির সামান্য অংশ হইয়া ধ্বংস করিতে পারি না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন