রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে একই মঞ্চে একসঙ্গে ফাঁসি কার্যকর হলেও অধ্যাপক ড. মিয়া মো. মহিউদ্দিন ও কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলমের লাশ পৃথকভাবে ফরিদপুরের ভাঙা থানার জাব্দি গ্রাম এবং রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানার খোঁজাপুরে দাফন করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে জানাযা শেষে ভাঙ্গা উপজেলার তুজারপুর ইউনিয়নের জাব্দী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ড. মহিউদ্দিনে লাশ দাফন করা হয়। এর আগে ভোর ৬টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর খোঁজাপুর গোরস্থানে দাফন করা হয় জাহাঙ্গীর আলমকে। জানাযার নামাজে মিয়া মহিউদ্দিন এবং জাহাঙ্গীর আলমের স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) রাতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক থেকে তার ছোট ভাই আরজু মিয়া, ড. মহিউদ্দিনের লাশ গ্রহণ করেন। শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে মহিউদ্দিনের লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স তার গ্রামের বাড়ি পৌঁছায়। তবে লাশের সঙ্গে মহিউদ্দিনের স্ত্রী ইশরাত রহমান ও তাদের সন্তানরা গ্রামের বাড়িতে যাননি। মহিউদ্দিন এক মেয়ে ও এক ছেলের বাবা। তারা রাজশাহীতেই বসবাস করেন। তারা লাশ গ্রহণ করতে কারাগারেও যাননি। তবে গত ২৫ জুলাই স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের দিন মহিউদ্দিনের ভাই ও বোন গ্রাম থেকে রাজশাহী আসলে তাদের সঙ্গে মহিউদ্দিনের স্ত্রী ইশরাত রহমান কারাগারে গিয়ে স্বামীর সাথে দেখা করেন। তবে তাদের দুই সন্তানের কেউ কারাগারে যাননি।
মহিউদ্দিনের ভাই আরজু মিয়া বলেন, মহিউদ্দিনের স্ত্রী ও সন্তানরা এতই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত যে, লাশের সঙ্গে তাদের গ্রামে আসার মতো অবস্থা নেই। মেয়েটা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
এলাকাবাসী জানান, মহিউদ্দিন ভাঙা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ১৯৮১ সালে ভাঙা কে এম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষে তিনি একই বিভাগের শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ফলে হাতেগোনা কয়েকবার তিনি বাড়িতে যান। ২০০৬ সালে অধ্যাপক তাহের হত্যার মামলায় গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের হলেও মহিউদ্দিন গ্রামের বাড়িতে যাননি।
মিয়া মহিউদ্দিনের স্বজনরা দাবি করেন, ‘মহিউদ্দিন সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন। তারা ন্যায়বিচার পাননি। সাংবাদিকরা লিখতে লিখতেই তাকে ফাঁসির দড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এই মামলার এক নম্বর আসামি খালাস পেয়েছে। অথচ চার নম্বর আসামি মহিউদ্দিনের ফাঁসি হয়েছে।’
ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে অধ্যাপক তাহেরের মেয়ে সেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ বলেন, ‘এই ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পেলাম। এর জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ এই প্রতীক্ষা আমাদের কীভাবে কাটাতে হয়েছে? তা কীভাবে বলবো?
উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোয়ার্টার প-২৩ বাসায় ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক তাহেরকে হত্যা করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে বাসার পেছনের ম্যানহোল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যা মামলার তদন্তে উঠে আসে, পদোন্নতি না পাওয়ার ক্ষোভে অধ্যাপক তাহেরকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন একই বিভাগের শিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। এ মামলার বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক চারজনকে ফাঁসির আদেশ দেন। সাজাপ্রাপ্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করলেও আদালত মিয়া মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের ফাঁসি রায় বহাল রাখেন। এরপর আসামি মহিউদ্দিনের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়।
