কেন এই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন?

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৩, ০৭:০০

বেসরকারি দাতব্য সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। প্রতি বছর এই সাগর পাড়ি দিতে গিয়া নৌকাডুবিতে গড়ে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটিয়া থাকে। একই সংস্থার তথ্য মতে, ২০২১ হইতে ২০২৩ সালের জুন মাস অবধি ২৯ হাজার ৭৭৮ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি জমাইয়াছেন। আর ২০০৯ হইতে ২০২৩ অবধি এই সাগরে পাড়ি জমাইয়াছেন ২৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৯৪ জন বাংলাদেশি।

উল্লেখ্য, অবৈধ মানব পাচারকারী দালালেরা বড় জাহাজে করিয়া ইতালি লইয়া যাইবে বলিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভ দেখাইয়া থাকে। ইহার পর তাহারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদিগকে সাধারণ নৌকা বা উদ্ধারকারী বোটে উঠাইয়া সাগরে রওনা দেয়। পরবর্তীকালে তাহাদের লইয়া যাওয়া হয় লিবিয়া, সেইখান হইতে নৌপথে তিউনিসিয়া হইয়া ইতালি যাওয়ার সময়েই ঘটিয়া থাকে অধিকাংশ নৌডুবি। অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা সবচাইতে অধিক বাছিয়া লয় ভূমধ্যসাগরের পথটিকে। গত বছরেই লিবিয়ায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা ছিলেন সর্বাধিক। এই পথে বিদেশ পাড়ি জমাইবার ক্ষেত্রে একেক জন অভিবাসনপ্রত্যাশী খরচ করিয়া থাকেন প্রায় ৩ হইতে ১৫ লক্ষ টাকা।

উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান দেখিয়া মনে প্রশ্ন জাগে যে, জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ-তরুণী তৃতীয় বিশ্বের দেশ হইতে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি জমাইতেছে? আসলে এই সকল দেশে রহিয়াছে ব্যাপক দারিদ্র্য, রহিয়াছে কর্মসংস্থানের যথেষ্ট অভাব। তাই উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশায় ও বেকারত্বের অভিশাপ ঘুচাইতে বেকার লোকেরা বিদেশ পাড়ি দিতে মরিয়া হইয়া উঠে। সামাজিক বিজ্ঞানের অভিবাসন তত্ত্ব মতে, তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বিদেশ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে সকল সময় এক ধরনের ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করিয়া থাকেন। অর্থাৎ যতক্ষণ অবধি বিদেশ পাড়ি জমাইয়া কর্মসংস্থানের খোঁজ করিবার ঝুঁকি দেশে থাকিয়া দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থায় চাকুরি খুঁজিবার ঝুঁকির চাইতে কম হইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অভিবাসন প্রক্রিয়াটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ারূপে চলিতে থাকিবে, হউক তাহা বৈধ কিংবা অবৈধ। সুতরাং, বিদেশ যাওয়ার পথ আপাতদৃষ্টিতে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হইলেও দারিদ্র্যপীড়িত ও বেকার জনগণের নিকট তাহা অত্যন্ত লোভনীয়। অথচ, এই সকল দেশের রাজনৈতিক দলগুলি তাহাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘরে ঘরে চাকুরির জোগান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়া থাকে; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য, নির্বাচন শেষ হইয়া গেলে, এই সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব দেখা যায়। তাহা হইলে যাহা বাস্তবায়ন করা যায় না, এমন প্রতিশ্রুতি কেন দেওয়া হয়?

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বহুল আলোচিত ‘অবৈধ অভিবাসন বিল’কে আইন হিসাবে পাশ করাইবার তোড়জোর চলিতেছে। এই আইন মোতাবেক, পূর্বের ন্যায় আর ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ নৌপথে যুক্তরাজ্যে আসিয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আশ্রয়ের আবেদন করিতে পারিবেন না, পারিবেন না এই দেশে থাকিয়া যাইয়া নতুন জীবনের সূচনা করিতে। বরং, এই পন্থা অবলম্বন করিয়া যাহারা যুক্তরাজ্যে আসিবেন, তাহাদিগকে হয় গ্রেফতার করা হইবে, না হইলে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হইবে, অথবা রুয়ান্ডার মতো তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করা হইবে। মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি হইতে আন্তর্জাতিক মহলে ইহা বেশ কঠোর একটি নীতি বলিয়া সমালোচিত হইলেও, জাতীয় স্বার্থের দিক হইতে ইহা বেশ সময়োপযোগী নীতি বলিয়াই বিবেচিত হইতেছে সেই সকল দেশে। ইহা ছাড়া সমগ্র ইউরোপে আজ অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থিদের উত্থান ঘটিতেছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে করোনা-উত্তর ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সকল আইনকানুন প্রণয়ন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নহে। এই নির্মম বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির উচিত নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধান করা। অর্থাৎ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নতি সাধন করা। এই জন্য যুগোপযোগী ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। অবৈধ পথে অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে গড়িয়া তোলা প্রয়োজন গণসচেতনতাও।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন