এক প্রজাতির পাখি হঠাত্ বোবা হইয়া গিয়াছে। পাখিটির নাম রিজেন্ট হানিইটার। আহা মধু যাহারা খায়, তাহারা কেন কণ্ঠহারা হইবে? পাখিরা তো কিচিরমিচির করিবে, গান গাহিবে। কবি বলিয়াছেন—‘একবার ভেবে দেখ ভেবে দেখ মন/ পৃথিবীতে পাখি কেন গায়।’
পাখি কেন গান গায়—ইহার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা অনেক পূর্বেই দিয়াছেন। পাখিরা তাহাদের কূজন কিংবা গানের মাধ্যমে তথ্যের আদানপ্রদান করিয়া থাকে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে বিপত্সংকেত, অনুরাগ, প্রেম এবং বংশবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা; কিন্তু কোনো এক প্রজাতির পাখি যদি গান গাওয়া ভুলিয়া যায়—তাহা হইলে ইহার নেপথ্য বিপদের ইতিহাস জানিতে হইবে। রিজেন্ট হানিইটার ছিল গায়ক পাখি। গবেষণায় বলা হইয়াছে, গান ভুলিয়া যাওয়ার কারণে তাহারা বিপন্নও হইয়া পড়িয়াছে। এখন প্রশ্ন হইল, গান ভুলিয়া যাওয়ার জন্য বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে, নাকি বিপন্ন হইবার কারণে তাহারা গান ভুলিয়া গিয়াছে? এই প্রশ্নে পরিবেশ-প্রতিবেশের বিপন্নতার কথাই সকলের পূর্বে আসিবে। সেই দিকে ব্যাখ্যা করিবার মতো অনেক কিছুই রহিয়াছে। আমরা এই ক্ষেত্রে বুঝিয়া দেখিতে পারি, একটি প্রজাতি মূক বা বোবা হইয়া গেলে, কথা বলিতে ভুলিয়া গেলে কীভাবে তাহারা বিপন্ন হইয়া পড়ে। কিছুদিন পূর্বে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রিজেন্ট হানিইটার পাখির ব্যাপারে বলা হইয়াছে, এই পাখি একসময় দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় বিপুলসংখ্যায় বসবাস করিলেও এখন মাত্র তিন শতের ঘরে নামিয়া আসিয়াছে। সুতরাং স্পষ্টভাবেই তাহারা এখন পুরাপুরি নিশ্চিহ্ন হইয়া যাওয়ার প্রহর গুনিতেছে। তাহা হইলে সমীকরণটি এইরকম দাঁড়াইল, কেহ যখন কথা বলিতে ভুলিয়া যায় তখন তাহারা বিপন্ন হইয়া পড়ে। কিংবা বলা যায়, বিপন্ন হইয়া পড়িলে কথা বলা ভুলিয়া যাইতে হয়। আর তখন তাহাদের বিলীন হইয়া যাওয়াটাও কেহ আটকাইতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছেন—‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি,/ হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী।’ তাই, তো; পাখি গান বন্ধ করিলে রাখাল তো বেণু বাজাইতেই পারে; কিন্তু এই বেণু বাজাইবার মতো রাখাল তো থাকিতে হইবে। তাহা না হইলে কবির কথা অনুযায়ী মধ্যদিনেই নামিয়া আসিবে শ্মশান নীরবতা।
এখন আমরা খুব সহজেই বুঝিতে পারি, কূজন কিংবা গানের মাধ্যমে পাখিরা যেইভাবে নিজেদের টিকাইয়া রাখে, সেই পাখিরাই যদি মূক হইয়া পড়ে, গান গাইতে ভুলিয়া যায়, তাহা হইলে তাহাদের অবস্থা রিজেন্ট হানিইটারের মতো হইবেই। মানবজীবনও কি একই রকম নহে? কোনো জাতি যদি তাহার কথা বলিবার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে, তবে তাহারা কি ক্রমশ বিপন্ন হইয়া পড়িবে না? কিংবা উলটা করিয়া বলিতে পারি, কোনো জাতি যদি অন্তঃসলিলার মতো তলে তলে বিপন্ন হইয়া পড়ে তাহা হইলে কি তাহারা কথা বলিবার ক্ষমতা ক্রমশ হারাইয়া ফেলিবে না? কোথাও যদি তৈরি হয় এমনই পরিবেশ, যেইখানে কথা বলার চাইতে চুপ থাকাটাই শ্রেয়—সেইখানে কি রিজেন্ট হানিইটার পাখির মতো মানুষও ক্রমশ মূক বা বোবা হইয়া যাইবে? আমাদের এইভাবে অনেক জিজ্ঞাসার মধ্যে ফেলিয়া দিতেছে রিজেন্ট হানিইটার পাখি।
তাহা হইলে এত কিছু না ভাবিয়া আমরা কবিগুরুর ‘অনন্ত জীবন’ কবিতার মতো বলিতে পারি—‘অধিক করি না আশা, কীসের বিষাদ/ জন্মেছি দুদিনের তরে,/ যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে/ গান গাই আনন্দের ভরে।’ সুতরাং আমাদেরও বুঝিতে হইবে—সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে সকলকেই যাইতে হইবে। যাহা মনে আসে, তাহার পথ রুদ্ধ করিয়া কী লাভ? বোবা থাকিয়াও কি খুব অধিক লাভ আছে? কথায় বলে—বোবার শত্রু নাই; কিন্তু মিত্রও তো নাই। বরং বোবায় আছে বিপন্নতা—রিজেন্ট হানিইটার পাখির মতো। সুতরাং রিজেন্ট হানিইটার পাখি হইতে শিখিবার আছে অনেক কিছু।
