নার্সিং শিক্ষার মানোন্নয়ন

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৩, ০৪:০০

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নার্সিং পেশা স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অনুষজ্ঞ। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের যে আদর্শ লইয়া একসময় নার্সিং পেশা শুরু হইয়াছিল তাহা আজ শাখা-পল্লবে বিস্তৃত হইয়া বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করিয়া চলিয়াছে। সমগ্র বিশ্বে নার্সিং শিক্ষার অনেক উন্নতি হইয়াছে। আজকাল এই ক্ষেত্রে বিএসসি, এমএসসি এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিও প্রদান করা হইতেছে। ইহাতে নার্সদের বেতন-ভাতাসহ সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাইয়াছে; কিন্তু বাংলাদেশে নার্সিং-সেবা সম্প্রসারিত হইলেও সেই তুলনায় এই শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায় নাই। নার্সিং শিক্ষায় বিরাজমান নানা সংকটের অবসানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ বৃদ্ধি করিবার প্রয়োজনীয়তা আজ অনস্বীকার্য।

নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৮ ও ৩৭২টি। আসনসংখ্যা যথাক্রমে সাড়ে ৬ ও ২৪ হাজার। সেই হিসাবে এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রয়োজন ৬০০ জন। তবে বর্তমানে সকল প্রতিষ্ঠান মিলাইয়া শিক্ষক রহিয়াছেন ৪০০ থেকে ৫০০ জন। শিক্ষকসংকটের কারণে নার্সিং শিক্ষার মানের অবনতি ঘটিতেছে। বিশেষ করিয়া এই পরিস্থিতির উত্তরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক নিয়োগের তাগিদ দিলেও মালিকগণ তাহা কর্ণপাত করিতেছেন না বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। বেসরকারি নার্সিং কলেজসমূহের আরো কিছু সমস্যা রহিয়াছে যাহা অনুপেক্ষণীয়। যেমন—৩৭২টি নার্সিং কলেজের মধ্যে ৩১৫টিতেই নাই নিজস্ব হাসপাতাল। তাহা হইলে নার্সরা হাতেকলমে শিখিবে কীভাবে? বেসরকারি ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় শিক্ষক আনিয়া পাঠদান করিতেছে। স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগে করা হইতেছে গড়িমসি। ছাত্রাবাস ও ইন্টার্ন শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল-সুবিধাও নাই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লইয়াছেন; কিন্তু নিয়ম মানিয়া ঠিকমতো পরিচালনা করিতেছেন না। দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ কম থাকায় এক ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ক্লাস লওয়া হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাই স্থায়ী ক্যাম্পাস। ল্যাবরেটরি, মিলনায়তন ও অডিও ভিজুয়াল কক্ষের অভাবও বিদ্যমান। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো থাকিলেও লোকবল ও শিক্ষা উপকরণের সংকট প্রকট। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় শিক্ষার্থীদের কোনো এক হাসপাতালে গিয়া টাকার বিনিময়ে কাজ শিখিতে হয়। এইভাবে কি নার্সিং শিক্ষার উন্নতি আশা করা যায়?

সমগ্র দেশের বেসরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে যেইভাবে জোড়াতালি দিয়া চলিতেছে, তাহা আর বেশি দিন চলিতে পারে না। যোগ্যতাসম্পন্ন প্রয়োজনীয় নার্স তৈরির লক্ষ্যে বেসরকারি নার্সিং প্রতিষ্ঠান ও নার্সিং কোর্স চালু-সংক্রান্ত যেই নীতিমালা রহিয়াছে তাহার বাস্তবায়ন চাই আমরা। এই নীতিমালায় নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম ৩০ হাজার বর্গফুটের ভবন, প্রতিষ্ঠানের নামে ১০ লাখ টাকার এফডিআর, রেজিস্ট্রি করা জমি ও দক্ষ প্রিন্সিপাল থাকিবার কথা বলা হইয়াছে। ভর্তির আসন বিবেচনায় প্রতি চার শিক্ষার্থীর বিপরীতে থাকিবেন এক জন শিক্ষক। ব্যাবহারিক শিক্ষায় আট শিক্ষার্থীর জন্য থাকিবেন এক জন শিক্ষক। ইহার পাশাপাশি থাকিবে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, মিলনায়তন, অডিও ভিজুয়াল কক্ষ ও হাসপাতাল। এখন প্রশ্ন হইল—এই নীতিমালা কি কেবল কাগজে-কলমেই থাকিয়া যাইবে? নীতিমালার তোয়াক্কা না করিয়া যেইভাবে ভুয়া কাগজপত্র, মিথ্যা তথ্য ও জাল সনদ প্রদর্শন করিয়া বিভিন্ন জেলায় নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজ গড়িয়া তোলা হইতেছে তাহার অবসান হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এইভাবে শিক্ষার্থীদের ঠকাইলে শেষ পর্যন্ত দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতিসাধন হইবে। কেননা একজন রোগীকে সুস্থ করিয়া তুলিতে চিকিত্সকের পাশাপাশি নার্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, নার্সিং শিক্ষা লইয়া অবহেলা প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নাই। এই জন্য নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর ও কাউন্সিলকে কার্যকর উদ্যোগ লইতে হইবে। নার্সিং শিক্ষার সংকট নিরসন ও শিক্ষার মান উন্নয়ন লইয়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল ও বেসরকারি নার্সিং প্রতিষ্ঠানসমূহের মালিকদের সহিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হইয়াছে। আমরা আশা করি, এই বৈঠক হইতে ইতিবাচক ফলাফলই লাভ করিবে। নার্সিং শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন ও কারিকুলামের আরো আধুনিকায়নের উপর গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। 

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন