টঙ্গীর বস্তিগুলো যেন মাদকের হাট!

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৩, ১৩:৫৬

ঢাকা উত্তরের শেষ সীমানা খালের মতো চিকন এই তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গী। রাজধানী লাগোয়া শিল্পনগরী এটি। এই টঙ্গীকে ‘মাদকের হাট’ও বলা হয়। ঢাকা শহরের মাদক, মদ এবং নারী থেকে শুরু করে সকল অপরাধ জগতের যেন একটা ‘নো ম্যানস ল্যান্ডের’ আউটলেট এরিয়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে টঙ্গী।

গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ১৯টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তির অলিতে-গলি সর্বত্রই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডেল, মদ, গাজা, হেরোইন, প্যাথেডিন ইনজেকশনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এসব মাদক ব্যবসায়ীরা টঙ্গী থানা এলাকাকে যেন মাদকের হাটে পরিণত করছে।

রাজধানী লাগোয়া শিল্পনগরী টঙ্গীর বস্তি। ছবি: সংগৃহীত

টঙ্গীরকেন্দ্রিক রাজনীতির মিটিং-মিছিলে লোক সংগ্রহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন কাজে বস্তিবাসীরাই বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে খুব প্রিয় ও সবচেয়ে কার্যকর। টঙ্গীর প্রত্যেকটি বস্তিই যেন অপরাধের স্বর্গরাজ্য! মাদকের হাট হিসেবে পরিচিত ভয়ঙ্কর বস্তিগুলো হচ্ছে টঙ্গী বাজার এলাকার গোহাটা বস্তি, হাজী মাজার বস্তি, হোসেন মার্কেট, কফিল উদ্দিন রোড, এরশাদ নগর বাস্তুহারা বস্তি, নতুন বাজার এলাকার ব্যাংকের মাঠ বস্তি, আমতলি এলাকার কেরানীরটেক বস্তি, রেলওয়ে বস্তি, মাছিমপুর এলাকার জিন্নাতের পেছনের বস্তি, নিশাতনগর এলাকার পেছনের বস্তি, চুড়ি ফ্যাক্টরির বস্তি, তেতুলতলা বস্তি, সিপাই পাড়া বস্তি, নামা বাজার বস্তি, কলাবাগান বস্তি, বেক্সিমকোর পেছনের বস্তি, টঙ্গী মেডিকেলের পেছনের বস্তি, পরানমন্ডলের টেক কাঠালদিয়া বস্তি, আউচপাড়া এলাকার মোল্লা বাজার বালুর মাঠ বস্তি, নোয়াগাও এলাকার বাহার আলীর টেক বস্তি, নেকারবাড়ী বস্তি, বেলতলা বস্তি, সান্ডারপাড়া বস্তি, সাতইশ এলাকার নাজিম ফ্যাশনের পেছনের বস্তি, গুটিয়া বস্তি, ইন্টান্যাশনাল মেডিকেলের পেছনের বস্তি, খৈরতুলের ব্যাংকপাড়া বস্তিসহ নাম না জানা আরও অনেক বস্তি ও এর অলিগলি মাদকের মোকাম হিসেবে পরিচিত। রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মাদকের এই ভয়ঙ্কর নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

এখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ নারী। এসব মাদ্রকসম্রাজ্ঞী মাদকের কারবার করে গড়েছেন বিপুল সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি। অনেকে তারপরও থাকেন বস্তিতে। তবে খুবই সতর্কতার সঙ্গে তারা মাদক ব্যবসা করেন। বেশিরভাগ সময় অপরিচিত কারও কাছে মাদক বিক্রি করেন না কারবারিরা।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মাদকের হাট ও ক্রাইম জোন তালিকায় শীর্ষে টঙ্গী পূর্ব এবং পশ্চিম থানা এলাকা। মাদকমুক্ত করার চেষ্টা চললেও কয়েক যুগ ধরে এই এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা জায়, টঙ্গীর মাদক পরিচালনায় নেপথ্যে রয়েছেন এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা।

টঙ্গীতে প্রকাশ্যে মাদক কেনা-বেচা। ছবি: সংগৃহীত

এর মধ্যে অধিকাংশ মদদদাতার বসবাস টঙ্গী রেল জংশনের চারপাশে। ফলে টঙ্গীর মাদক নির্মূল করতে প্রশাসনের চেষ্টা বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। কিছু মাদক ব্যবসায়ী টাকার বিনিময়ে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের পদ-পদবি নিয়ে এলাকায় তারা মাদকের রাজত্ব গড়ে তুলেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সন্ধ্যার পর দেখা যায়, এসকল এলাকার মাদক কারবারিরা রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের আস্থাভাজন হতে টঙ্গী রেল জংশন এলাকায় জমায়েত হয়। তাদের সঙ্গে ছবি তুলে স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচার করে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দাবি করে আসছেন। এতে স্থানীয় প্রশাসন তাদের গ্রেপ্তার করতে হিমশিম খাচ্ছে। এদের মধ্যে স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতাকে মাদকসহ গ্রেপ্তারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে মাদক কারবার করে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন অনেকে। এখন তারা সরকারদলীয় রাজনীতিতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করছেন।

এসব বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মাহাবুব-উজ জামান বলেন, মাদকের বিষয়ে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিদিন বিভিন্ন বস্তি এবং মাদক স্পট থেকে মাদকের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। টঙ্গীতে প্রায় ২০ লাখের অধিক লোক বসবাস। স্বল্প সংখ্যক পুলিশ দিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

ইত্তেফাক/এসকে