তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী প্রয়োজন

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৪৫

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যথেষ্ট এগিয়েছে এবং আগাচ্ছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রটি কেবল জিডিপি, মাথাপিছু আয়ের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকেই দৃশ্যমান নয় বরং প্রসূতি মৃত্যুর হার কমেছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ইত্যাদি সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলোতেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। করোনা ভাইরাস-সংকট মোকাবিলা করেও বিগত অর্থবছরে উল্লেখযোগ্যহারে প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সব খাতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে প্রদীপের নিচেই যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি যখন জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে তখন কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা পড়ছে হুমকির মুখে। এর পেছনে অন্যতম প্রভাবক তামাক ও তামাকজাত পণ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় পৌনে ৪ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। কর্মক্ষেত্রসহ পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয় ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। দেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সি তামাক পণ্য ব্যবহারাকারীর হার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। পরোক্ষ ধূমপায়ীর হার ১৮ শতাংশ। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীর হার ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। তামাক ব্যবহারের ফলে হৃদরাগ, স্ট্রোক, ক্যানসারসহ নানাবিধ রোগে মানুষ আক্রান্ত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য (২০১৮) অনুযায়ী দেশে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতিদিন প্রায় ৪৪৪ জন মানুষ মারা যায়। তামাকের এই বহুল ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০১৮ অনুসারে, তামাকজনিত নানা রোগে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। এ ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

আশার কথা, বাংলাদেশ সরকার জনস্বাস্থ্যের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০২২ সালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি বিশ্বমানে উন্নীত করতে সংশোধনী প্রস্তাব প্রণয়ন করে। ১৬ জুন ২০২২ তারিখে সংশোধনী প্রস্তাব জনমত যাচাইয়ের জন্য জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে এবং সংশোধনীর পক্ষে ১৬ হাজার জনেরও বেশি ইতিবাচক মতামত প্রদান করেন। মতামত প্রদানকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ১৬৯ জন সংসদ সদস্য। ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে চূড়ান্ত সংশোধনীটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদে প্রেরণ করা হয়।

প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছয়টি হলো— ১. সকল প্রকার উন্মুক্ত স্থান এবং গণপরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্ত করা ২. তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা ৩. বিক্রয় কেন্দ্রে তামাক দ্রব্যের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা ৪. ই-সিগারেট বা ইমার্জিং হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট আমদানি, উত্পাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা ৫. তামাক পণ্যের সকল প্রকার খুচরা শলাকা বিক্রয় বন্ধ করা এবং ৬. বিড়ি ও সিগারেটের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করা।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রণীত বিদ্যমান আইনটির দুর্বলতা নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। এ লক্ষ্য অর্জনে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের নির্দেশনাও দেন তিনি। সরকারের অঙ্গীকার থাকার পরও তামাক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক উদ্যোগ আটকে রয়েছে দীর্ঘ সময়। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক।

টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে জনসাধারণের বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের এই আইনটি দ্রুত পাশে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দরকার। পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে আইনটি পাশ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যেহেতু সংশোধিত খসড়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর হলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের যে ফাঁকগুলো রয়েছে, সেগুলো বন্ধ হবে। এছাড়া তামাকের ব্যবহার কমবে ও নতুন করে জনগণ তামাক গ্রহণে নিরুত্সাহিত হবে। এতে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির হাত থেকে অধূমপায়ীরাও রক্ষা পাবে। এছাড়া গণপরিবহনে ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে। শুধু তামাকবিরোধী সংগঠন নয়, সর্বস্তরের মানুষ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আইনটি পাশ করতে একযোগে কাজ করতে হবে। ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়তে এর বিকল্প নেই।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী কল্যাণ সমিতি; সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন