তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অস্বাভাবিক পরিস্থিতি

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৩০

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে অস্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসাবে অভিহিত করিলেও অত্যুক্তি হয় না। এই সকল দেশের রাজনীতির কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। যেমন—ক্ষমতায় থাকিলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি বিচার বিভাগের সহায়তায় বিরোধী দলগুলির উপর নানাভাবে ধরপাকড় চালানো হয়। পরিহাসের বিষয় হইল, যিনি বা যাহারা এইভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হন, ক্ষমতায় গিয়া তাহারা আবার একই পন্থা অবলম্বন করেন। এইভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বলিতে গেলে সর্বদা লাগিয়াই থাকে। রাজনৈতিক অস্থিরতার রেশ ধরিয়া এই সকল দেশের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিও হইয়া পড়ে নাজুক ও স্থবির। গতকাল এই উপমহাদেশের একটি দেশে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের প্রধানকে নিজ বাসভবন হইতে গ্রেফতার করা হইয়াছে। তোশাখানা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হইলে তাহার ও তাহার আইনজীবীর অনুপস্থিতিতেই তাহাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও এক লক্ষ রুপি জরিমানা করা হইয়াছে। নানা নাটকীয়তার মধ্যে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীত্ব চলিয়া যাওয়ার পর এই বছর মে মাসে তাহাকে প্রথম বার গ্রেফতার করা হইয়াছিল। সেই গ্রেফতারের পর সেই দেশটি জুড়িয়া ছড়াইয়া পড়ে ব্যাপক সহিংসতা। এমনকি ক্ষমতার নাটের গুরু সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরেও হামলা চালানো হয়। তবে এইবার গ্রেফতারের পর  গতকাল পর্যন্ত তেমন কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায় নাই যাহা বিস্ময়কর।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে বিদেশি যেই সকল উপহার পাইয়াছিলেন তাহা ঠিকমতো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়া আত্মসাৎ করিয়াছেন। উন্নত দেশে সামান্য অভিযোগেও জাতীয় নেতাদের বিচারের মুখোমুখি হইতে দেখা যায়। যেমন—সাবেক এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আদালতে এমন একটি মামলা বিচারাধীন যাহার মূল অভিযোগ হইল তিনি গোয়েন্দা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ফাইল বাসায় রাখিয়াছেন। কোনো জাতীয় নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন মামলা হইতে পারে, তাহা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে কল্পনাতীত। এই সকল উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী বিধায় চুন হইতে পান খসিয়া পড়িলেই যে কাহারো জীবনে বিপদ ঘনাইয়া আসিতে পারে। সেইখানে আইনের চক্ষুকে ফাঁকি দেওয়ার তেমন কোনো অবকাশ নাই; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে পুকুরচুরির মতো বড় বড় অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইলেও তাহার প্রতিকার পাওয়া কঠিন। ক্ষমতায় থাকাকালে এমন অপরাধ করিলেও কেহ তাহার বা তাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারে না। ‘সাত খুন মাফ’—ইহার মতো প্রবাদবাক্যের উদ্ভব কেবল এই সকল দেশেই সম্ভব; কিন্তু ক্ষমতা হইতে অপসারিত হওয়া মাত্রই যুক্তিযুক্ত মামলা তো বটে, অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে তাহাদের বিরুদ্ধে ঠুনকো, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলাও দায়ের হইতে থাকে একের পর এক। এমনকি কাহারো কাহারো বিরুদ্ধে পাঁচ শতাধিক মামলাও দায়ের করা হয় যাহার অধিকাংশের আসলে কোনো মেরিট নাই। মেরিট থাকুক আর না থাকুক এই সকল দেশে রাজনৈতিক মামলা শেষপর্যন্ত দমনপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই কারণেই নরমাল বা স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে না।

বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশে যাহা ঘটিতেছে তাহা সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ চিন্তাও করিতে পারেন না। যেইখানে আইনকানুন ও সভ্যতা-মানবতার কোনো স্থান নাই। জোর যাহার মুল্লুক তাহার নীতিই এখানে প্রবল। তাই উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য আমাদের দুঃখ হয়। এই সকল দেশে প্লেগের মতো সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে দুর্নীতি। এই জন্য এই সকল দেশে সহজে ও স্বাভাবিক নিয়মে কিছুই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নহে। মূলত এই সকল দেশের মানুষের শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা সর্বোপরি অসচেতনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করা যায়। উন্নয়নশীল দেশে এমন পরিস্থিতি সত্যিই বেদনাদায়ক। এই জন্যই দরিদ্র ও উন্নয়নশীল বিশ্বে বারে বারে দেখা যায় অস্থিরতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত। এবং ইহাতে এই সকল দেশ শেষপর্যন্ত লাভ করে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন