কক্সবাজার শহর জুড়ে এখন ছিনতাই আতঙ্ক। শহরের প্রবেশদ্বার লিংকরোড়-বাস টার্মিনাল, বাইপাসসহ বিভিন্ন এলাকা পেশাদার ছিনতাইকারীদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে চলে। প্রতিদিনই তাদের হাতে সর্বস্ব হারাচ্ছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মতে, শহরের বাস টার্মিনাল, উত্তরণ আবাসিক এলাকা, নতুন জেলগেট, বিজিবি ক্যাম্প এলাকার আমতলা, সাবমেরিন গেট, সিটি কলেজ গেট, আলীর জাহাল রোড, গরুর হলদা সড়ক, হাশেমিয়া মাদ্রাসা গেট, খুরুশকুল রাস্তার মাথা, টেকপাড়া মসজিদ রোড়, ম্যালেরিয়া অফিস সড়ক, বার্মিজ স্কুল রোড়, বৌদ্ধমন্দির সড়ক, হাসপাতাল সড়ক, ভোলা বাবুর পেট্রোলপাম্প, লালদীঘির পাড় ও গাড়ির মাঠের মুখ, হলিডে মোড়, ৬নং মাথা, সার্কিট হাউস সড়কের ম্যাজিস্ট্রেট কলনীর সামনে, অরুনোদয় স্কুল, গোলচক্কর মাঠ, ডিসির ডাক বাংলো সড়কের মাথা, জইল্ল্যার দোকান মোড়, জাম্বুর মোড় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাথা ও পাশের সড়ক, লাবণী মোড়, গোলদীঘির পাড়, বাজারঘাটাসহ পৌর এলাকার ৩০টির অধিক স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বেশি।
বুধবার (২ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ঝিলংজা ইউনিয়নের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পারভেজসহ তিনজন আহত হয়েছেন।
আহত পারভেজের ভাগিনা আরিফুল ইসলাম জানান, পারভেজ তার বন্ধু হামিদ ও রশিদ একটি মোটরসাইকেলে করে কলাতলীর দিকে যাচ্ছিলেন। তারা বাসটার্মিনাল এলাকায় পৌঁছালে একজনের বাঁচাও বাঁচাও শব্দ শুনে মোটরসাইকেল থামান। এরপর হেঁটে একটি অটোরিকশা লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া মাত্র ফিল্মি স্টাইলে চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ধরে হামলা করে ছিনতাইকারীরা। পরে তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
একই দিন ভোর ৬টায় শহরের ভিআইপি সড়কখ্যাত সার্কিট হাউজ রোডের ম্যাজিস্ট্রেট কলোনির সামনে টমটম থামিয়ে চার ছিনতাইকারী মিরসরাই সরকারি টেক্সটাইল কলেজের শিক্ষার্থী সামির উদ্দিনকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সবকিছু নিয়ে যায়। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গত মাসে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মধ্যম হ্নীলার কুতুবদিয়া পাড়ার মোহাম্মদ আলীকে তুলে নিয়ে এক লাখ ১১ হাজার টাকা কেড়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় শহরের মোহাজের পাড়ার জসিম ও শাহাদাতকে অভিযুক্ত করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান সড়ক ও এর আশাপাশ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সড়কবাতিই নষ্ট। সন্ধ্যা হলেই শহরজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে। রাত ১২টার পর দোকানপাট বন্ধ হলে আরও অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ। তখন ছিতাইকারীরে দখলে চলে যায় শহর।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক সমাজকর্মী বলেন, কক্সবাজারে গত মাস ছয়েক ধরে দুর্বৃত্তায়ন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় মাত্র ৭০০ টাকা ছিনিয়ে নিতে এক বেসরকারি চাকরিজীবীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। একই এলাকায় আরও অনেকে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জখম হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাই বলা চলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থ পুলিশ।
সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকার ব্যবসায়ী ওবাইদুল হোছাইন জানান, সপ্তাহ দেড়েক আগে তার মার্কেটে কাজ করা অ্যালোমোনিয়ম মিস্ত্রি মুহাম্মদ ওসমান রাত ১০টার দিকে কাজ শেষ করে হলিডে মোড় এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। এসময় বাচ্চার জন্য দুধ কিনতে পুবালী ব্যাংকের সামনে যাওয়া মাত্র কয়েকজন ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে এলোপাতাড়ি মারধর করে সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এখন সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে তাড়াহুড়ো করে আতঙ্কিত ওসমান।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রসিদ্ধ পর্যটন নগরী হিসেবে ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘ্ন চলাফেরার সুযোগ থাকা দরকার। তাই পর্যটনের স্বার্থে যেকোন মূল্যে ছিনতাইকারীদের দমন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার বাসটার্মিনাল এলাকায় সামির হোসাইনরা ছিনতাইয়ের কবলে পড়ার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি ছুরিসহ তিনজনকে শুক্রবার ভোরে আটক করা হয়েছে। ওই ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে মামলা হয়। শুক্রবার আরও দুটি মামলা করা হয়েছে গ্রেপ্তাদের বিরুদ্ধে।
ওসি বলেন, ছিনতাই রোধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। দিনে-রাতে পুলিশের ৫-৬টি টিম শহরের নিরাপত্তায় কাজ করছে। প্রতিদিনই সন্দেহভাজদের আটক করে যাচাইয়ের পর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। সপ্তাহে কমপক্ষে ২০ জন পেশাদার ছিনতাইকারী আইনের আওতায় এসেছে বলে দাবি করেন ওসি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলামের মতে, কক্সবাজার অন্য জেলা শহর থেকে ভিন্ন। এখানকার অপরাধের ধরণ ও অপরাধীদের বিচরণও অন্য রকম। এখানকার অধিকাংশ ছিনতাইকারী আইনের চোখে অপ্রাপ্ত বয়স্ক। তবুও আমরা তাদের গ্রেপ্তার করি,আদালতে পাঠাই। তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। ফের ছিনতাই শুরু করে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, পর্যটন শহর হিসেবে হাত বাড়ালেই দোকানে দোকানে মেলে নানা দেশি ছুরিসহ ধারালো অস্ত্র। এসব দোকানে একাধিক বার অভিযানও চালানো হয়েছে। দুয়েকদিন বন্ধ থাকলেও নিরবে আবারো শুরু হয় ধারালো অস্ত্র বিক্রি। শহরকে অপরাধমুক্ত করতে হলে পুলিশের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ীসহ অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। লাভের লোভ ফেলে দিয়ে ধারালো অস্ত্র বিকিকিনি বন্ধ করতে হবে। নিজের সন্তানদের ওপর নজর রাখতে হবে বাবা-মা ও অভিভাবকদেরকে।
