দীর্ঘদিন যাবত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। গত ৪-৫ আগস্ট পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র উদ্যোগে হাওরে পরিবেশ বিপর্যয় ও এর সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে কাজ করতে, বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশবিদদের একটি পরিদর্শন দল হাওরের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের নেতৃত্বে এই টিমে ছিলেন পবা’র সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ, পবা’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কবি শাহেদ কায়েস, বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পরিবেশবিদ আতিকুর রহমান খান পূর্ণিয়াসহ আরো কয়েকজন পরিবেশবিদ, স্থানীয় পরিবেশকর্মী এবং ঢাকা থেকে আগত ও স্থানীয় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক।
পরিবেশবিদদের পরিদর্শন দলটি গত দু’দিন যাবত দু’টি নৌকায় চড়ে যাদুকাটা নদী, ঘাগরা পাড়, ঘাইট্টার পাড়, লাউড়ের গড়, টেকের ঘাট এবং টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় গ্রামবাসী, পর্যটক ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে হাওরে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে কথা বলেন, মত বিনিময় করেন।
এছাড়া পরিদর্শন দলটি গত ৪ আগস্ট যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা বন্ধে এলাকাবাসীর প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন এবং বক্তব্য রাখেন। যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা বন্ধ করতে গ্রামবাসীর উদ্যোগে ঘাগটিয়া গ্রাম সহ ২০ টি গ্রাম রক্ষার দাবিতে ৪ আগস্ট, শুক্রবার বিকালে যাদুকাটা নদীর তীরে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছে। ঘাগটিয়া গ্রামবাসীর আয়োজনে এবং পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে ঘাগটিয়া গ্রাম সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের ভুক্তভোগী মানুষ যোগ দেন।
ঘাগটিয়া টেকেরগাঁও-এর বয়োজ্যেষ্ঠ সামরুজ আলীর সভাপতিত্বে এবং পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি ও ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা কাসমির রেজা'র সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, গ্রামবাসীর মধ্যে সাবেক ইউপি সদস্য মনির উদ্দিন, মো. আবু তোরাব, মো. আস্তারুল, মো. আকাশ মিয়া, আশিক উদ্দিন প্রমুখ।
গ্রামবাসী তাদের বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ দিন থেকে যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে ড্রেজার, বোমা মেশিন দিয়ে নদীর পাড় কাটা হচ্ছে। এতে আমাদের বসত বাড়ি ভেঙ্গে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী বালু খেকো চক্র আমাদের মারধর করে এবং মামলার হুমকি দেয়।
সমাবেশে উপস্থিত ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের গৃহিণী রাজিনা বেগম (৫০) বলেন, পাড় কাটতে কাটতে তারা আমার বাড়ির উঠান কাটা শুরু করেছে। আমি বাধা দিলে আমার উপর হামলা করে এবং আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। এখনো তাদের পাড় কাটা চলছেই। যেকোনো মুহূর্তে আমার বাড়িটা নদী গর্ভে চলে যাবে।' তিনি তার বসত ভিটা রক্ষায় সবার সহযোগিতা চান।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, নদীর পাড় কাটায় এই এলাকার পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ অপকর্ম বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পুলিশ প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এ অন্যায় কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, নদীর পাড় কাটার কারনে ঘাগটিয়া গ্রাম সহ ২০ টি গ্রাম হুমকির মুখে। ইজারার কথা বলে তারা পাড় কাটছে। নদীর পাড় কখনো ইজারা দেওয়া হয় না। এটা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালায় এতে সাময়িকভাবে পাড় কাটা বন্ধ হয়। আবার শুরু হয়। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই। দৃষ্টি নন্দন এই নদীর তীরে জিও টেক্সটাইলের ব্যাগ দিয়ে ওয়াল তৈরি করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলে এর তীর রক্ষা পাবে এবং পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ হবে।'
