মা হ বু ব আ ল ম
কবি তাঁর কবিতায় কী রচনা করে যাচ্ছেন? তাঁর সেই রচনা কবির ভক্তের মনে কী প্রভাব ফেলছে? তার দায় কবির উপরে বর্তায় কি না? এমন নানাবিধ বিষয়ে কবিকে তাঁর এক ভক্তের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটকে।
কবি বা সহিত্যিকদের সাধারণ মানুষের মতো মনে হলেও, তাঁরা প্রত্যেকেই আসলে সমাজের আইকন হিসেবে বসত করেন অন্য মানুষের মনে। তাঁদের দ্বারা প্ররোচিত হয় সমাজের নানা বয়সের মানুষ। বিশেষত, তরুণ ও যুবকরা দারুণভাবে প্রভাবিত হন কবি বা সহিত্যিকদের দ্বারা। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটক তেমন এক সংকটের গল্প তুলে এনেছে মঞ্চে। বুদ্ধদেব বসুর গল্প ‘অনুদ্ধারণীয়’ অবলম্বনে নাটকটির মঞ্চরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন থিয়েটার আর্ট ইউনিটের অন্যতম অভিনেতা ও নির্দেশক মোহাম্মদ বারী। মূল গল্পকে সমকালীন রূপ প্রদানে কিছুটা এদিক সেদিক করেছেন, এটা বোঝায় গেছে যখন সমসাময়িক বৈশ্বিক ঘটনাবলি নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যা তো এখন বাংলাদেশের জন্য একেবারে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যা হোক, অমিত একজন তরুণ যুবক। সে কবির কবিতা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয় দেশপ্রেমে। কবির প্রেম ও ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হয় সে। কিন্তু যখন সেই টগবগে যুবক কবির লেখা কবিতায় প্রতারণার ছাপ দেখতে পায়, তখন তার প্রেম-ভালোবাসা পর্যবসিত হয় ঘৃণায়। প্রতারক কবিকে সে তুলে নিয়ে আসে এক নির্জন জায়গায়। আবেগ ও বিবেক তাড়িত নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে থাকে সে কবিকে। কবি অবশ্য অমিতের সব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারে না। অবশেষে অমিত কবিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে কবিকে উদ্ধার করতে র্যাব চলে আসে। ঘিরে ফেলে অমিতকে। অমিত গুলি করে। মঞ্চের আলো সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায়। নাটকের সমাপ্তিতে বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে, অমিত কি নিজে নিজেকে গুলি করেছে নাকি কবিকে! এই দোলাচল দর্শকের ভাবনার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন নির্দেশক মোহাম্মদ বারী। তবে নাটকের গল্প বুননের যে গতি, তাতে মনে হয় অমিত কবিকে গুলি করেছে। কেননা, অমিতের চোখে কবি একজন পথভ্রষ্ট নষ্ট মানুষ। সমাজের এমন কীটকে সে বাঁচিয়ে রাখতে চায় না। যদি অমিতের দৃষ্টিকোণ থেকে নাটকটিকে পর্যালোচনা করা হয়, তবে অমিতের এমন সিদ্ধান্তও আইনবিরুদ্ধ কাজকে উসকে দেয়। আবার যদি ধরে নিই যে, অমিত নিজেকে গুলি করেছে, অর্থাত্ আত্মহত্যা করেছে, তখন সেটিও হয় সততার পথ থেকে যুব সমাজের পলায়নপরতার প্রকাশ। আসলে কে, কেন, কাকে গুলি করে সেটি অন্ধকারেই থেকে যায়। দর্শক ভাবনার পাঠ হয়ে যায় অনুদ্ধারণীয়। দর্শক নিজের মতো করে উত্তর বের করে নিতে পারে। তবে, কোনো মৃত্যুই কাঙ্ক্ষিত নয়।
এবার নাট্য নির্মাণের কুশলতার দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক। নাটকের সাজেস্টিভ সেট ব্যবহার খুব সাবলীল মনে হয়েছে। অভিনেতার পোশাক বর্তমান সময়কে বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করে। আলোর ব্যবহার ও ভিজুয়্যাল প্রজেকশনের মাধ্যমে বিশ্বের স্বনামধন্য চিত্রকরদের চিত্রকর্ম নাটকের গল্পের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। তবে নাটকটিতে ‘কবি’ চরিত্রে মোহাম্মদ বারীর অভূতপূর্ব অভিনয় যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি ‘অমিত’ চরিত্রে মেহমুদ সিদ্দিকী লেলিনের অভিনয় সেই ভালোলাগায় যেন ছেদ টেনেছে। সংলাপের আড়ষ্ঠতা, উচ্চারণ আর শেষ শব্দের পতন, অর্থাত্ টেইল ড্রপের কারণে খুব কষ্ট করে নাটকে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়েছে। হয়তো আগামী প্রদর্শনীতে অভিনেতা নিজেকে শুধরে নিয়ে ভালো করবেন। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটকটি উত্তরোত্তর ভালো অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করুক দর্শকহূদয়।
নাটকে মোহাম্মদ বারী ও মেহমুদ সিদ্দিকী লেলিন ছাড়াও অভিনয় করেছেন অপ্সরা মৌ, মাজিদুল মিঠু, মাহফুজ সুমন, নুরুজ্জামান বাবু, সরকার জামান, এস আর সম্পদ, মোহাম্মদ রাকিব, আকাশ মোদক ও আশিকুর রহমান।
