মৃত্যু হইতে কয়েক সেকেন্ডের দূরত্বে তাহারা পাঁচ জন একটি প্রাইভেট গাড়ির ভিতরে বসিয়া ছিলেন। ঘটনাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের কাছে। সেইখানে কনটেইনারবাহী একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া উলটাইয়া পড়ে একটি চলন্ত প্রাইভেট কারের উপর। মুহূর্তেই আশপাশের বহু মানুষ জড়ো হইলেও তাহারা ছিলেন নিরুপায়। কারণ কনটেইনারবাহী প্রায় ৪০ টন ওজনের লরিটিকে সরাইবার সাধ্য ছিল না সাধারণ মানুষের। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসিয়া লরিটি সরাইলে সেইখানে চাপা পড়া প্রাইভেটকার হইতে উদ্ধার করা হয় পাঁচ আরোহীকে। এত ভারী লরির নিচে দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া যাওয়া গাড়ির মধ্যে কাহারো বাঁচিয়া থাকিবার কথা নহে। কিন্তু বিস্ময়কর কথা হইল, গাড়ির ভিতরকার দুই শিশুসহ বাকি তিন জন সামান্য আহত হইয়াছেন মাত্র। তাহারা সকলেই বাঁচিয়া গিয়াছেন। শুধু তাহাই নহে, ঐ ৪০ টন লরির নিচে চাপা পড়িয়া ঐ পাঁচ জন আরোহী দেড় ঘণ্টা যাবত্ আটকা পড়িয়া ছিলেন। এমন ঘটনা শুনিয়া আমাদের মনে বিস্ময় জাগিতে পারে—এইভাবেও বাঁচিয়া ফিরা যায়!
যায় বটে। কারণ, এই বিপুলা পৃথিবীতে বিস্ময়ের শেষ নাই। জীবন-মৃত্যু তো মহান সৃষ্টিকর্তার হাতে। সেই কারণে অনেকই মৃত্যুর দুয়ার হইতে ফিরিয়া আসিতে পারেন। আবার উলটা করিয়া বলা যায়, অনেকেই অতি সামান্য কারণে মারা যাইতে পারেন। অর্থাৎ পচা শামুকেও পা কাটিতে পারে, সেইখান হইতে সংক্রমণ হইয়া দেখা দিতে পারে জীবনসংশয়ও। বস্তুত, যতক্ষণ পর্যন্ত কাহারো মৃত্যুর সময় আসিবে না, ততক্ষণ অবধি কোনো ভয়ংকর বিপদই তাহার প্রাণসংহার করিতে পারিবে না। আবার মৃত্যুর সময় আসিলে সেইখান হইতে কেহই পালাইয়া যাইতে পারিবে না। এই ব্যাপারে একটি শিক্ষণীয় কাহিনী রহিয়াছে। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.)-এর একজন পরাক্রমশালী মন্ত্রী ছিলেন। দাউদ (আ.) মৃত্যুবরণ করিবার পর তাহার পুত্র সোলাইমান (আ.) বাদশাহ নির্বাচিত হন। তখন সেই মন্ত্রী পুনরায় নবী সোলাইমান (আ.)-এর মন্ত্রী নিযুক্ত হন। একদিন সোলাইমান সকালবেলা তাহার রাজ-মজলিসে বসিয়া আছেন। ঐ মন্ত্রীও সেই মজলিসে ছিলেন। আচমকা সেইখানে এক লোক প্রবেশ করিয়া সালাম দেন। তিনি সোলাইমান (আ.)-এর সহিত কথাবার্তা বলিতে শুরু করিলেও তাহার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল মন্ত্রীর দিকে। ইহাতে সেই মন্ত্রী ভয় পাইয়া যান। লোকটি কিছুক্ষণ পর চলিয়া গেলে মন্ত্রী সোলাইমান (আ.)-কে জিগ্যেস করিলেন, ‘হে নবী! আপনার নিকট হইতে যেই লোকটি চলিয়া গেলেন—তিনি কে? তিনি কেন আমার দিকে এইভাবে তাকাইয়া ছিলেন?’ সোলাইমান (আ.) বলিলেন, ‘তিনি মালাকুল মউত বা মানুষের প্রাণ কবজকারী। একজন লোকের আকৃতি ধারণ করিয়া তিনি আমার নিকট আসিয়াছিলেন।’ এই কথা শুনিয়া মন্ত্রী আরও ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলেন। তিনি ভয়ে কাঁদিতে শুরু করেন। আর মনে মনে বলেন—‘হে আল্লাহ! আমি তো মৃত্যুর কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করি নাই।...’ মন্ত্রী ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া নবী সোলাইমানকে (আ.) বলিলেন যে, তাহাকে যেন হিন্দুস্তানের কোনো দূরবর্তী স্থানে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। মন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করিলেন নবী সোলাইমান (আ.)। তাহাকে হিন্দুস্তানে পাঠাইয়া দেওয়া হইল।
পরদিন মালাকুল মউত আবার সোলাইমান (আ.)-এর নিকট আসিলেন। তখন সোলাইমান (আ.) তাহার নিকট জানিতে চাহিলেন, ‘গতকাল তুমি আমার মন্ত্রীর দিকে এইভাবে তাকাইয়া ছিলে কেন? তোমার আচরণে সে ভীষণ ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে।’ মালাকুল মউত বলিলেন, ‘আমি আপনার নিকট গতকাল সকালে আসিয়াছিলাম। অথচ আল্লাহ তাআ’লা আমাকে জোহরের পর হিন্দুস্তানে লোকটির জান কবজ করিবার আদেশ দিয়াছিলেন। আমি তাহাকে আপনার মজলিসে দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গিয়াছিলাম। ভাবিতেছিলাম, লোকটি এইখানে কেন? তাহার তো এইখানে থাকিবার কথা নহে।’
সুতরাং সময়ের আগে কিছুই হইবে না। সময় আসিলে কোনো পথ দ্বারা তাহা রুদ্ধ করা যাইবে না। ইহাই পরম নিয়তি। ইহার ব্যত্যয় হইবার নহে।
