‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে’—সেই কবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় ভিটেমাটিসহ সর্বস্ব হারানো উপেন বলেছিল অমৃতসম এই চরণটি। দেড় শ বছরের অধিক সময়ে পেরিয়ে মায়ের মমতার কাছে এই আবেদন চিরন্তন, চিরকালের সম্পদ যেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রায় প্রত্যেক মা-বাবা সন্তানদের জন্য নিজেদের সাধ-আহ্লাদ অপূর্ণ রেখে সমগ্র জীবনপণ ঢেলে দিতে দ্বিধা করেন না। তাদের সন্তানকে প্রকৃত মনুষ্যবোধে অনুপ্রাণিত করতে চান সুশিক্ষায় ও মানবিক মূল্যবোধে। অতঃপর সন্তানদের সুদিন, সুখ্যাতি, বিত্তপতি অবস্থানটিও দেখে যেতে চান জন্মদাত্রী ও জন্মদাতা—দুজনেই। অন্তত নিজেদের অভাব-অনটনের সংসারের দুঃখকষ্ট যেন সন্তানদের সইতে না হয়, তারা যেন কিছুটা হলেও উন্নত ও সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে—সেই কামনা করেন সর্বক্ষণ।
মধ্যযুগের ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যের ঈশ্বরী পাটনী (নৌকা পারাপার যার জীবিকা) তিনিও যে কোনো পিতা-মাতার মতো দেবীর কাছে বর চান তার সন্তানদের জন্য—প্রণমিয়া পাটনী কহিলো জোড়হাতে—‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।’ প্রার্থনার জোরেই হয়তো-বা পিতা-মাতাকে ছাড়িয়ে অর্থবিত্তে অনেক বড় হয়ে ওঠে আমাদের পরম সন্তানেরা। কেউ কেউ সন্তানের ভালোবাসা, আদর-সমাদরের কিছুটা হলেও পেয়ে থাকেন। কেউ-বা স্বপ্ন বুকে নিয়েই বুক পেতে দেন মৃত্তিকাবাসে। ছেলে কিংবা মেয়ে দুই জনেই সন্তান, তাদের প্রত্যেকে মাকে নিয়ে বেশি, বাবাকে নিয়েও মমতার অক্ষরে, ভালোবাসার সুতোয় গাঁথা বেলিফুলের সুবাস ছড়ানো লেখাগুলো লেখেন। আবেগের উত্তাপে ও উষ্ণতায় অন্তরবাহী সেসব লেখা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি, আনন্দ লাভ করি। আর মনে মনে ভাবি, আহা, বাবা মায়েরা যদি সন্তানের এমন হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসার কথাগুলো নিজ কানে শুনে যেতেন, কিংবা সর্বাংশে সন্তানের ব্যবহারে তা পেতেন! সেই মা বাবাও হয়তো রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো করে বলতে পারতেন—‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।’
সত্যি তো, এমন কথা বলবার, এমন সুসন্তান জন্মদানের ভাগ্য কয় জন পিতামাতার ভাগ্যে জোটে? এরকম দুই-এক জন ভাগ্যবান মা-বাবা এখনো সমাজে আছেন, তবে তা উদাহরণ হিসেবে ব্যতিক্রম। দেশের আপামর জনতার মূল্যবোধ পালটে গেছে। রক্তের সম্পর্ক দূরে ঠেলে লাভজনক সম্পর্কের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে সমাজবাস্তবতা। আমাদের অতীত মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাক বাংলাদেশ এবং নবগঠিত বাংলাদেশের মূল্যবোধ আর আগের মতো নেই। এর পেছনে নৃতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক এবং সমাজ বিন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক কারণও দায়ী। ইতিহাস বলে, যে কোনো যুদ্ধোত্তর দেশে পূর্বের মূল্যবোধসমূহের অবক্ষয় ঘটে। প্রচলিত নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটে এজন্য যে, যুদ্ধ মানেই সংহার। নিজেকে রক্ষা করতে হলে শত্রুপক্ষের কাউকে হত্যা করতেই হবে। এজন্য যুদ্ধকালীন মানুষকে একটিমাত্র মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে যে—‘হয় মরো, না হয় মারো।’ ফলে সদ্যস্বাধীন দেশে পূর্বের মূল্যবোধ ফিরে চাওয়া বা ফিরে পাওয়া কোনোটি সম্ভব নয়। তবে এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রাক-স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা-উত্তর নতুন-পুরোনো মূল্যবোধসমূহ ভেঙেচুরে একধরনের নতুন মূল্যবোধের সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে—যা একটি দেশের প্রাথমিক ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য। সর্বজনস্বীকৃত যে মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে যতটা আমাদের অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল—তা হয়নি। কেন হয়নি, সেটিও আমাদের জানা।
পঁচাত্তর সালে জাতির পিতার এক নৃশংস হতাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনা দুই দশক পিছিয়ে দিয়েছে আমাদের। বিশেষভাবে ইনডেমনিটি বিল—যার অর্থ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার হবে না, বরং বড়বড় পোস্টিং দিয়ে বিদেশে রেখে তাদের জীবনব্যবস্থাকে বিস্ময়করভাবে উন্নত করা হয়েছে। ইনডেমনিটি নামক এই একটি আইনের ফলে দীর্ঘকাল আপামর জনগণের মনের মধ্যে যে সততা, ন্যায্যতা, পাপের শাস্তি, অন্যায়, অপরাধের বিচার হয়, কিংবা হত্যাকাণ্ডের বিচার একদিন হবেই হবে—এ জাতীয় যে বিশ্বাস ও মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল বা ক্রিয়াশীল ছিল—তা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। পক্ষান্তরে জোর যার মুল্লক তার, হত্যা করলে শাস্তি হয় না। সমাজে এই ধারণা প্রকট হলো যে, অর্থ থাকলে অনর্থ করা যায়। চারদিকে পেশিশক্তির জয় জয়কার। জ্ঞানের কিংবা জ্ঞানীর কোনো মূল্য নেই, টাকা না থাকলে। এই বিষক্রিয়া সমাজের সর্বাংশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ড যে কোনো সময়ের চেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায় সমাজ অভ্যন্তরে। এরকম সমাজ বাস্তবতায় যাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা—সংগত কারণেই সেসব সন্তানের সম্মুখে আমরা কোনো আদর্শ তুলে ধরতে পারিনি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে ১ কোটির অধিক মানুষ প্রবাসে আছে। ইতিমধ্যে প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তনে এক মিশ্র সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে চলছি আমরা। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেহারা পালটে যাচ্ছে দিনে দিনে। তবে এখনো যাদের অর্থবিত্তের কমতি নেই, তারা হয়তো মা-বাবার জন্য অনেক করেন। মা-বাবাকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আর বিলাসব্যসনময় জীবন উপহার দিয়ে থাকেন। দুদণ্ড তাদের সম্মুখে বসে কথা বলবার সময় নেই যে!
এতেই জন্মের ঋণ সব শোধ হয় গেল—এটি ভাববার কোনো অবকাশ নেই। সুন্দর আলোকিত এই পৃথিবী দেখবার সৌভাগ্য যারা করে দিয়েছেন, সেই পিতামাতার সঙ্গে সন্তানের ব্যবহারটি হতে হবে যথাযথ। যেমন গুরুর প্রতি শিষ্যের ভক্তি ও নমনীয়তা। কিংবা অধস্তন কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতি যে আচরণ বা সমীহ প্রকাশ করে। সেটি হবে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সঠিক আচরণ—যা একদা এ দেশের মা-বাবার প্রতি সন্তানেরা প্রদর্শন করেছে। কৃষক পিতাকে নবীন কৃষকপুত্র গুরুজ্ঞানেই জমিতে ফসল ফলানোর শিক্ষালাভ করত। আমাদের দেশের অনেক সন্তান বিদেশে আলিশান বাড়ি, গাড়ি—বিদেশি স্টাইলের জীবন যাপন করেন। বুকে হাত দিয়ে কয় জন বলতে পারবেন যে, তার এই ঐশ্বর্যের কতটুকু অংশীদার হতে পেরেছে তার বাবা-মা।
নিজ পরিবার-সন্তান নিয়ে কয়েকটি মহাদেশ হয়তো ভ্রমণ করেছেন। একবারও কি মনে হয়েছে, আমাদের তৃতীয় বিশ্বের মা-বাবা নিজের দেশটিকে ঠিকমতো ঘুরে দেখবার সংগতি হয়নি, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে? যে বাবা-মা প্রতিদিন তারা নিজেদের স্বপ্ন-সাধ-আহ্লাদকে গলা টিপে হত্যা করে সন্তানের জন্য বড় বড় স্বপ্ন দেখেছেন, সেই সন্তানদের কি মনে হয় না বিদেশে এনে তাদেরও অন্তত দুই-তিনটি দেশে ভ্রমণ করিয়ে নিজের আনন্দকে ছড়িয়ে দিই গুরুজনদের প্রতি? এই ধানমন্ডিতেই আমাদের প্রতিবেশীর একমাত্র পুত্রকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন পড়াতে। এক পর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়লে কলকাতার হাসপাতালে তার চিকিত্সা চলে। পিতা পুত্রকে দেখতে চাইলে অনেক অনুরোধের পরে আমেরিকা থেকে কলকাতায় এসে দেখা হয়। পরের দিন পিতা মারা যান। মা ছেলেকে অনুরোধ করেছিল—নিজ হাতে বাবার কবরটা দিয়ে তারপর না হয় ছেলে ফিরে যাক আবার। পিএইচডির দোহাই দিয়ে ছেলে ফিরে গেছে আমেরিকায়, পিতার কবর দেওয়ার সময় হয়নি তার। ওখান থেকেই ফিরে গেছে আমেরিকায়। আমরা যখন লাশ দেখতে গিয়েছি, ভাবি আমাকে ধরে কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘ভাবি, আমি সন্তানকে বড় করতে চেয়েছি বটে; কিন্তু এত বড় করতে চাইনি যে, পিতার কবর দেওয়ারও সময় হবে না ওর।’
অনেক ক্ষেত্রেই শেষ বয়সের বৃদ্ধ বাবা-মা বেশির ভাগ সন্তানের কাছেই বোঝাস্বরূপ। অতিথি বিশেষ। ছেলেমেয়ে নতুন ফ্ল্যাট বা বাড়ি করলেও সেখানে পিতা-মাতার জন্য কোনো আলাদা ঘর নির্দিষ্ট থাকে না। থাকে একটি গেস্টরুম, বাবা-মা, ভাইবোন কিংবা বন্ধু এলেও সেই ঘরে অবস্থান নিতে হয় তাদের। অথচ বাবা-মায়ের যখন বাড়ি করবার সুযোগ হয় তখন সবচেয়ে সুন্দর রুমটি ছেলের, এরপর মেয়ের, শেষটা নিজেদের জন্য রাখে। এই দৈন্য ঘরে ঘরে একই রূপে, প্রথাগত চিন্তার ফসল বই অন্য কিছু নয়। ছেলের সংসারে জায়গা হলেও পুরোনো আসবাবপত্রের মতো ঘরের এক কোণে পড়ে থাকতে হয় তাদের। একাধিক সন্তান থাকলে ভাগাভাগি করে থাকতে হয় মা-বাবাকে। যে বয়সে দুই জন অশক্ত মানুষ পরস্পরের হাত ধরাধরি করে বাঁচার কথা, পরস্পরের মনে সাহস ও মমতা জোগাবার বয়স—সেই সময় দুই জন দুই জায়গায় বিরহ-কাতর সময় পার করেন। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে সন্তানের সমাদরেও থাকেন কোনো কোনো বাবা-মা—তবে সংখ্যায় তারা খুব বেশি নয়। ইদানীং আমাদের দেশেও অনেক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। অনাথ অচল বাবা-মাকে নিয়ে সন্তানেরা যেন বিব্রত বোধ না করে, সেজন্য অনেক বাবা-মা আগেই বৃদ্ধাশ্রমে থাকবার কথা ভাবছেন ইদানীং। নিঃসঙ্গ বা অবহেলায় থাকার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে থাকার কতগুলো ইতিবাচক দিক আছে অবশ্যই। তবে চাইলেই তো বৃদ্ধাশ্রমে থাকা যায় না, যারা বৃদ্ধাশ্রমের ব্যয় বহন করতে পারবেন, কেবল তারাই জায়গা পেতে পারেন। অন্যথায় মুখ গুঁজে সন্তানদের কাছে থেকেই শেষ বিদায় জানাতে হবে অসহায় পৃথিবীকে।
লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ
