জাতির জিজ্ঞাসা: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কেন হয়নি প্রতিরোধ?

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৩, ২২:০২

ইতিহাসের এক জঘন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা ১৫ আগস্ট। সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃংখল  জওয়ানদের ব্রাশফায়ারে  বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যাই করা হয়নি, হত্যার পর লাশ সিঁড়িতে ফেলে রেখেই কীভাবে ক্ষমতায় যাবেন এবং মন্ত্রিসভা কীভাবে গঠিত হবে, তা নিয়ে মুশতাকের নেতৃত্বে দেনদরবার শুরু হয়ে যায়। তৎকালীন  সেনাবাহিনী প্রধানের ভাষ্যমতে— “ বঙ্গবন্ধু  তাকে টেলিফোন  করলে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে আপাতত জান বাঁচানোর অনুরোধ করেছিলেন”। কিন্তু অকুতোভয় মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর উচ্ছৃংখল কিছু জওয়ানের ভয়ে পালিয়ে যাবেন, এমন  কাপুরুষোচিত ধারণা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ কীভাবে করেছিলেন— এটি একটি গবেষণার বিষয়। তিনি নিজে নীরব থেকে বঙ্গবন্ধুকে জাতির কাছে এবং ইতিহাসের কাছে হেয় প্রতিপন্ন  করার জন্য এমন একটি দুরভিসন্ধিমূলক পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

সামরিক সূত্রে  জানা যায়, সেনাপ্রধান শফিউল্লার নিরাপত্তার দায়িত্বে এক প্লাটুন সৈনিক ছিল। তাছাড়া ৪৬ ব্রিগেডে নিরাপত্তার দায়িত্বে দুই প্লাটুন সৈন্য সর্বক্ষণ স্ট্যান্ড বাই ছিল। অধিক সেনা সদস্যকে তাৎক্ষণিক মুভ করানো না গেলেও সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ  তিন প্লাটুন সৈন্য  নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেই মুভ করতে পারতেন। হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় ফজরের আজানের অব্যবহিত আগে বা পরে। বঙ্গবন্ধুর  বাড়ি আক্রমণ হওয়ার খবর পাওয়ার পর সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ তার বাসভবন থেকে কমপক্ষে পাঁচ বার বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসা যাওয়া করতে পারতেন।  তিনি  তা না করে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন ও এক গর্হিত অন্যায় করেছেন, যা ক্ষমার অযোগ্য। সেনাপ্রধান ওই তিন প্লাটুন সৈনিক ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে মুভ করালে ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো। এতে সৈনিকদের মধ্যে যে আক্রমণ—পাল্টা আক্রমণ হতো, সময় ক্ষেপণ হতো — তাতে ঘাতকদের হত্যা প্রচেষ্টা  বিফলে যেত বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞগণ। দীর্ঘক্ষণ গোলাগুলি চললে বিদ্রোহীরা হয় নিহত হতো, না হয় আত্মরক্ষার্থে  পালিয়ে যেত। অন্যদিকে, আজানের পরে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো।   

একজন সেনাপ্রধানকে শুধু  আত্মরক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর  এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়নি।  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মতো এমন ব্যক্তিত্বকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ জেনারেল শফিউল্লাহকে বঙ্গবন্ধুর হত্যার দায় নিতে হবে। আজ বাংলার  জনগণ জেনারেল শফিউল্লাহকে একবিংশ শতাব্দীর মীরজাফর বলে ঘৃণাভরে ধিক্কার প্রদান করে।   

অনেকে দাবি  করেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুশতাক সরকারকে উৎখাত করেছিলেন। তবে তিনি ১৫ আগস্ট কেন বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এগিয়ে  আসেননি ? খবর পাওয়ার পরেও কেন তিনি তার অধীনস্থ সেনাসদস্যদের নিয়ে মুভ করেননি? তিনি তো তখন ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডে অবস্থান করছিলেন। ৮৩ দিনের সরকার  খন্দকার মুশতাককে অপসারণ করার সফল্য যেমন খালেদ মোশাররফের : অন্যদিকে তার ব্যর্থতাও কম নয়। তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে  রক্ষা করতে পারেননি। তার অভ্যুত্থানকালীন জেলখানায় আটক আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে  তিনি রক্ষা করতে পারেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বন্দী করতে পারতেন। তিনি তা না করে তাদের অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।     

বস্তুতপক্ষে জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান থাকলেও সেনাবাহিনীর মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রভাব  ছিল অনেক বেশি। তৎকালীন  সেনাবাহিনীর উপপ্রধান  জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্ট কেন নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন? ওইদিন তার ভূমিকা ও পরবর্তী কর্মকাণ্ড  ছিল  রহস্যজনক ও ষড়যন্ত্রমূলক।
 
বঙ্গবন্ধু তাঁর নিকটস্থ এবং  নির্ভরযোগ্য সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বারবার ফোন করে তাঁর বাড়ির ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কথা   জানানোর পরেও সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র যেন অদৃশ্য কারণে  তাঁর সাথে তামাশা করে এবং প্রায় সকলেই নীরব ভূমিকা পালন করে একমাত্র কর্নেল জামিল ছাড়া।  বিশেষ করে রক্ষীবাহিনী   কোনোরকম প্রতিরোধ ছাড়াই অজ্ঞাত কারণে আগেভাগেই যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ন্যাক্কারজনকভাবে    কোনোরকমে লেজ গুটিয়ে  পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। ঢাকার রাজপথ তখন সামরিক জান্তাদের সার্বক্ষণিক টহলে প্রকম্পিত ছিল। হায়েনারা তখন ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার চতুর্দিক থেকে  ঘিরে রেখেছিল। সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান কোনোরকম প্রতিরোধ ছাড়াই মুশতাক সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রায় সকলেই কোনোরূপ প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ ছাড়াই মুশতাক সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন।  শুধু হায়েনাদের ষড়যন্ত্রে জেলখানায়  নিহত চার নেতা এ ঘৃণ্য কাজটি করেননি।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে,  অনেক সভা— সেমিনারে আলোচনা হয়েছে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় টকশো হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত  হয়নি।  ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ এখনও উন্মোচিত হয়নি। যে যার মতো করে মনগড়া পর্যালোচনা করছেন। অনেক সামরিক কর্মকর্তা নিজেদের ভীরুতা, ব্যর্থতা ও কাপুরুষতাকে ঢাকার জন্য কল্পিত বীরত্বগাথা প্রকাশ করছেন। তার মধ্যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথাও অনেকে তুলে ধরেছেন।
 
বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনা মাঠে ছড়িয়ে এবং এ হত্যাকাণ্ড  সেনাবাহিনীর বিপথগামী ও বিচ্ছিন্ন কিছু জওয়ানদের মনগড়া ষড়যন্ত্রের একটি ফলাফল এটি প্রচার করে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করে রাখা হয়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের  ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে আইনি সুরক্ষা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল, যাতে করে কোনো সরকার বা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ ওইসব কুখ্যাত হত্যাকারীদের আশ্রয়—প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, এদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন, দেশে—বিদেশে জামাই আদরে দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাই তারাও  এ হত্যাকাণ্ডের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। 

 আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করলেও উচ্চ পর্যায়ের সুবিধাভোগী যারা  ক্ষমতায় বা নেতৃত্বে  ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তীতে সুবিধাবাদী হয়ে মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন। মোটকথা, বঙ্গবন্ধুর হত্যার ব্যাপারে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত রহস্যজনক।

  ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল  অবধি   মুশতাক আহমেদের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভাটি কার্যকর ছিল। খন্দকার মুশতাক ১২ জন মন্ত্রী এবং ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভার ২৩ জন সদস্যের মধ্যে ২১ জনই ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন কেবিনেটের সদস্য। তাদের প্রায় সকলকেই আগের দফতর দেওয়া হয়েছিল।

১৫ আগস্ট  নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সাথে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শাখা-প্রশাখা শিকড়ের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার হদিস বাঙালি জাতির পক্ষে খুঁড়ে বের করা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা সময়ই বলে দিবে।  

খন্দকার মুশতাক আহমেদ প্রেসিডেন্টের পদ হারানোর পরেও দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সোচ্চার ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার রাজনীতিকে ঘৃণার চোখে দেখলেও, বঙ্গবন্ধুর খুনি হিসাবে তার ভূমিকাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার মতো সাহস দেখাতে পারেননি।  
ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপরে যতটা না আঙ্গুল তোলা হয়েছে, এর থেকে বেশি দায়ী করা হয়েছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাবাদী নেতাকর্মীদের।    রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যেসব প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল তা সবই  ছিল মিথ্যা, বানোয়াট, কল্পনাপ্রসূত এবং উদ্দেশ্যমূলক।      

১৫ আগস্ট —এর বিয়োগান্তক  ঘটনার পরে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো তেমন কোনো নেতাকর্মী ছিলেন না।   আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা নীরবে নিভৃতে নিজেকে আড়াল করতে রাজনীতিতে নিশ্চুপ হয়ে যান এবং গিরগিটির মতো রং পাল্টে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ—খাওয়ানোর জন্য মুশতাক এবং তাদের অনুসারীদের প্রদর্শিত সামরিক শাসন এবং সীমিত  গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের  পথ তৈরি করেন।

খন্দকার মুশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার একমাত্র সুবিধাভোগী ছিলেন না, তিনি ছিলেন "থিফ অব বাগদাদ”। সুযোগ পেয়েছেন,  ক্ষমতায় বসেছেন; যখন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি নিজেকে বাঁচিয়ে নীরবে সরে গেছেন। তবে তিনি যে ঘাতকদের সাথে ষড়যন্তে লিপ্ত ছিলেন এবং  বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে জানতেন তা ঐতিহাসিক  সত্য। বঙ্গবন্ধু  হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী  জিয়াউর রহমান পর্দার আড়ালে থেকে কেন নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার একটি ঐতিহাসিক দালিলিক পর্যালোচনা থাকা দরকার।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য যে ধরনের পরিবেশ তৈরি করার দরকার ছিল ৭৫ এর ১৫ আগস্ট— এর আগে এমন একটি নাটকের মঞ্চ যিনি বা যারা তৈরি করেছিলেন, সেই সমাজতন্ত্রীরা আজ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগিদার হওয়ার জন্য আওয়ামী রাজনীতির বড় অংশীদার। কিন্তু সমাজতন্ত্রীদের  থিংকট্যাংক সিরাজুল আলম খান এখনো পর্দার আড়ালে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপট রচনার মূল কারিগর জাসদ এবং তার মদদদাতা সদ্য প্রয়াত  সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বর্তমান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব সমাজতন্ত্রীরা আওয়ামী রাজনীতির ধামা—ধরা বচনে মাঠ গরম না করলে হয়তো তাদের রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরেই চিরতরে বিলীন হয়ে যেত। বস্তুত তথাকথিত ওইসব সমাজতন্ত্রীরা দেশের অভ্যন্তরে একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সেনাবাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বাংলায়  সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্নে বিভোর ছিল। বিশেষ করে কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে কেন  "বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা" গঠন করে বিশৃঙ্খলার পথ বেছে নিলেন? 

যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি পরীক্ষিত সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো সমাজতন্ত্র কায়েমের ফলাফল সম্বন্ধে সম্যক ধারণা থাকায় তৎকালীন সেনাবাহিনী সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিকে অনুসরণ করে পরবর্তীতে সীমিত গণতন্ত্র থেকে মনগড়া গণতন্ত্রের পথে দেশকে ধাবিত করার  প্রচেষ্টা চালায়। ৯০—এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সকল দল ও মতের লোকদের সমর্থনে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে  আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সব রকম পরিবেশ সৃষ্টি  হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী রাজনীতির ঘাড়ে ভর—করা পরগাছারা, আর যাই হোক বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুর হত্যায় মহোৎসবের রাজনীতিতে উদ্বেলিত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করেন নাই। এসব রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা ক্ষমতার লোভে যখন যে দলকে উপযুক্ত মনে করেছে, তখন সেই দলে ভিড়ে হত্যা এবং ষড়যন্ত্রের প্লট রচনা করে গেছেন  এবং এখনো করার পায়তারা করছে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে । 

বিক্ষিপ্তভাবে দু—এক জায়গায় প্রতিবাদ হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।  সুন্দরবনে বাঘের গর্জন শুনে যেমন বানর পালায়, তেমনি উচ্ছৃংখল কয়েকজন সেনা সদস্যের ভয়ে নেতারা পালিয়েছেন ও হাত  মিলিয়েছেন বিপথগামীদের সাথে। তারা এখন মাঠে আবার  বড় বড় কথা বলে মাঠ গরম করছেন। বঙ্গবীর  কাদের সিদ্দিকী ছাড়া শীর্ষ নেতৃবৃন্দের আর কাউকে বঙ্গবন্ধু হত্যার দৃশ্যমান প্রতিবাদে রাস্তায়   নামতে দেখা যায়নি। ঢাকায়  প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা  বীরউত্তম বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সীমান্তে প্রতিরোধ সংগঠিত করার সর্বান্তকরণের চেষ্টা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যখন দেশের পত্র-পত্রিকা গুলো বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে  তখন সদ্য প্রয়াত বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক সভাপতি  ডা. এস এ মলেক  এর সম্পাদনায় "রাজনীতি" নামক  পত্রিকার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে  নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালান। পরবর্তীতে   দেশ থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত করতে ডা. এস এ মালেকের নিরলস প্রচেষ্টা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ৭৫ পরবর্তী দলের দুঃসময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ও  আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তার প্রশস্ত কাঁধে তুলে দিতে ডাক্তার এস এ মালেকের ঐতিহাসিক  বলিষ্ঠ ভূমিকা ইতিহাসের আর এক আলোচিত অধ্যায়।          

দলের দুঃসময়ে লেজ গুঁটিয়ে পালানো নেতাদের আর কখনো বিশ্বাস করা যায় না। হাইব্রিড ও দলে অনুপ্রবেশকারীরা দলকে ভাঙিয়ে ফায়দা লুটার চেষ্টা করে, দলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এসব বসন্তের কোকিলরা  বিপদ দেখলে আগেভাগে কেটে পড়ে, যেমনটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর।     

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড পরবর্তী  ঘটনা, দূর্ঘটনা, অভ্যুত্থান, পাল্টা- অভ্যুত্থানের সার্বিক দিক বিচার, বিশ্লেষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত সব ঘটনাই  ছিল স্থূল ক্ষমতার লড়াই।      

যেভাবে বঙ্গবন্ধু তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করে নিজ দল আওয়ামী লীগকে গঠন করে দিয়ে গেছেন, এবং তাঁর কন্যা লৌহ মানবী এখনো সেই প্রচেষ্টার অগ্রযাত্রাকে ধরে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু যে আওয়ামী লীগ তৈরি করেছিলেন, তার থেকে বর্তমান আওয়ামী রাজনীতিক শক্তি স্বকীয়তা হারিয়ে মেদ-মাংসবিহীন অন্তঃসারশূন্য কঙ্কালে পরিণত হয়ে যেত, যদি  বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতার রাজনীতির হাল শক্ত হাতে ধরে না থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের বিচার হয়েছে, কিন্তু নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের এখনো বিচার হয়নি। ঘাতকদের মধ্যে যারা  বিদেশের মাটিতে এখনো রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে নিজেদের রক্ষা করছেন, তাদেরও দেশের মাটিতে এনে বিচারের মুখোমুখি করার এবং  দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক আইনের সহায়তা নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় পূর্ণাঙ্গ রূপে  বাস্তবায়ন এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া সময় যত গড়াবে, তত বেশি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের  নেপথ্যে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের মুখ ও মুখোশ জনগণের সামনে উন্মোচিত করার দাবি বাড়তেই থাকবে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের জীবিত অথবা মৃত সকল  দুষ্কৃতকারীদের অভিযুক্ত করে নতুন কমিশন গঠন করে  ঐতিহাসিক বিষয় বিচার —বিশ্লেষণ করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এতে জাতি যেমন কলঙ্কমুক্ত হবে, তেমনি ইতিহাসের সঠিক ধারা উন্মোচিত হবে। তাছাড়া সেনা ছাউনিতে গড়ে ওঠা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির সাথে জামাতের সখ্যতা স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী। তাদের জ্বালাও-পোড়াও ও আগুন সন্ত্রাসের রাজনীতি এখন জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। বেশিরভাগ জামাতের লোকজন বিএনপির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে  দেশের মধ্যে একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ব্যর্থ পায়তারা করছে। তাই জামাতের সাথে বিএনপিকে সমানভাবে দায়ী করে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল করার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।   

বঙ্গবন্ধুর পরিবার ৭৫—এর ১৫ আগস্টে যেমন নিরাপদ ছিলেন না, তেমনি ভূ—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোষ্টী পাথরের বিবেচনায় এখনো নিরাপদ নন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষমতার রাজনীতিতে নিরাপদ থাকলেও  বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ কখনও নিরাপদ আছেন বলে মনে হয় না।  

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যার একমাত্র ভরসাস্থল বাংলাদেশের সাধারণ মেহেনতি মানুষ,যারা জাতির পিতাকে যেমন ভালোবাসেন এবং তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও তেমনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন।

শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের নির্লিপ্ততা  ও গা ঢাকা দেওয়ার  কারণে সাধারণ মানুষ সেদিন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে পারেনি এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। 
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ চোখের জল ফেলেছে, নীরবে কেঁদেছে এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে দ্বৈত নীতি থাকে। তবে রক্তের ঋণের রাজনীতিতে দ্বৈত নীতি আত্মঘাতী। এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিশ্চয়ই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা খুঁজবেন। সময়ের দাবিকে প্রজ্জ্বলিত করতে বাংলাদেশের গণমানুষের প্রাণের এই দাবি পূরণের একমাত্র আশ্রয় বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের সুযোগ্য উত্তরাধিকার, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। 

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক জননেত্রী শেখ হাসিনার পথ চলা।  

লেখকঃ ফিকামলি তত্ত্বের জনক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক,  প্রেসিডিয়াম সদস্য-বঙ্গবন্ধু পরিষদ , প্রধান পৃষ্ঠপোষক — বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি

ইত্তেফাক/এএইচপি