রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় আর কত!

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৩০

সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি লইয়া দুর্নীতি ও অনিয়মের শেষ নাই। বিশেষত সরকারি প্রকল্পের গাড়ি লইয়া হরেক রকমের যে দুর্নীতির কথা বলা হয়, তাহা পত্রপত্রিকায় পড়িয়া ও জানিয়া বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এইভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যাহারা অপব্যবহার করেন, তাহারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারেন না। জ্বালানি ও অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে যে অপচয় করা হয় তাহাও এক বিস্ময়। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প শেষে সচল যানবাহন ৬০ দিনের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দিতে হইবে; কিন্তু অনেক সময় এই নির্দেশ পরিপালন করা হয় না। এই সকল গাড়ি কোথায়, কীভাবে ও কাহার মাধ্যমে ব্যবহার করা হইতেছে তাহাও থাকে অজানা। সরকারি গাড়ি বিলাস ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা নাই-বা বলিলাম, এই সকল গাড়ি গায়েবেরও নজির রহিয়াছে। শুধু গাড়ি নহে, প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত অন্য অনেক সাজসরঞ্জামের অনেক সময় হদিস মিলে না, যাহা খুবই দুঃখজনক। এই অপচয়ের অর্থ কেন জরিমানা আকারে আদায় করা হইবে না?

দুর্নীতিবাজদের নিকট এই দেশ যেন ‘সব পেয়েছি’র দেশে পরিণত হইয়াছে। একটি প্রবাদবাক্য বলে—‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’। ইহা হইতে এই দেশের মানুষের মন-মানসিকতা উপলব্ধি করাটা কঠিন নহে। জনগণের সম্পদকে এই দেশের অধিকাংশ মানুষ কেন নিজের মনে করিতে পারেন না? তাহারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর দিতেছেন বলিয়াই সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হইতেছে। ইহাতে জনগণ কোথায় তাহাদের সম্পদ লইয়া ছিনিমিনি খেলিবার অভিযোগে প্রশ্ন ও প্রতিবাদ করিবেন, তাহা না করিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহারা এই সম্পর্কে বেখেয়াল থাকিতেছেন বলিয়া তাহারা পদে পদে অধিকারবঞ্চিত হইতেছেন। নিঃসন্দেহে ইহা অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও অসচেতনতার ফল। এই সকল কথার অবতারণা করা হইল এই কারণে যে, পত্রিকান্তরে প্রকাশ, সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ তথা বিআইডব্লিউটিএর গাড়ি ক্রয়, ব্যবহার ও জ্বালানি ব্যয় লইয়া কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করিতেছে না। সরকার যখন করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর হইতে সর্বত্র কৃচ্ছ সাধন নীতি অবলম্বন করিয়া চলিতেছে, তখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি লইয়া চলিতেছে বিলাসিতা ও অনিয়ম। এই সংস্থার কয়েকটি প্রকল্প শেষ হইলেও সেইগুলির আওতায় ক্রয়কৃত গাড়ি জমা দেওয়া হয় নাই সরকারের পরিবহন পুলে। আবার সরকারি খাতে জমা দেওয়া হয় নাই পুরাতন গাড়ি বিক্রয়ের টাকা। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করিয়া গাড়ির জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উপেক্ষিত হইতেছে সরকারের নির্দেশনা। তথ্য গোপন করিয়া গাড়ি ক্রয়ের ঘটনাও ঘটিতেছে। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, সংগঠন ও সরঞ্জামাদির তালিকায় নাই—এমন ১৯টি গাড়ি রহিয়াছে এই সংস্থাটির যানবাহন পুলে। তাই এই সকল অনিয়ম তদন্ত করিয়া কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।

জানা মতে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের তিনটি খাতে গাড়ি ক্রয় করা হয়, যথা—সরকারি পরিবহন পুলের মাধ্যমে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি ক্রয়, প্রাধিকার কর্মকর্তাদের নিচে অন্য কর্মকর্তাদের অফিসে আনা-নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের নিজস্ব খাত হইতে মাইক্রোবাস ক্রয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পের টাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক গাড়ি ক্রয়। ইহার পাশাপাশি পরিবহন পুল হইতে সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী গঠিত কমিশন ও রাষ্ট্রীয় সকল ডেলিগেশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় যানবাহন। এই সকল গাড়ি ক্রয়, বরাদ্দ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে নিবন্ধন জটিলতা দূর করা প্রয়োজন, যাহাতে নিলামে বিক্রয়ের সময় কোনো সমস্যা না হয়। নিলামের ক্ষেত্রে যেমন অনিয়ম বাঞ্ছনীয় নহে, তেমনি নিলাম হইতে প্রাপ্ত অর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুকূলে প্রযোজ্য কোডের খাতে ঠিকমতো জমা করা বাধ্যতামূলক। অথচ কী হরিলুট-ই না চলিতেছে! এই সংক্রান্ত কোটি কোটি টাকা মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বা অপচয় নিঃসন্দেহে গর্হিত অপরাধ। ইহার সহিত যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করিয়া যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন