বিপর্যয়কর যুগসন্ধিক্ষণের মুখোমুখি আমরা

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৩, ০৬:৩০

সমগ্র বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী চিত্র প্রতিনিয়তই নূতন নূতন করিয়া প্রকট হইতেছে। বাংলাদেশও তাহার বাহিরে নাই। বর্ষাকালে বৃষ্টি হইবে, ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু কখনো অনাবৃষ্টি কখনো অতিবৃষ্টি সামগ্রিক আবহাওয়ার চিত্রকে কনট্রাস্ট করিয়া তুলিয়াছে। টানা কয়েক দিনের অতিবর্ষণে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়াছে। পাহাড়ধসসহ জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে ব্যাপক। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলাইয়া যাওয়ার ফলে ঐ সকল এলাকার মানুষ পড়িয়াছেন চরম দুর্ভোগে। বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কে পানি উঠিবার ফলে বান্দরবানের পর চট্টগ্রামের সহিতও কক্সবাজারের যান চলাচল ব্যাহত হইতেছে। গতকাল অবধি বান্দরবানের ৮০ শতাংশ এলাকা ছিল ১৫-২০ ফুট পানির নিচে। টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৬০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের অন্তত ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি। সামুদ্রিক জোয়ারের ঢেউয়ে মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্ট, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় অব্যাহত রহিয়াছে ভাঙন।

জলাবদ্ধতার জন্য ড্রেনগুলির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব কিংবা আরও অনেক অবকাঠামোগত সমস্যার কথা অনেক বলিয়াছেন বটে; কিন্তু কেবল বাংলাদেশ নহে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবহাওয়া আরও চরম ভাবাপন্ন ও তীব্র হইয়া উঠিতেছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে প্রথমে রেকর্ড মাত্রায় উষ্ণতা দেখা গিয়াছে। তাপপ্রবাহের পাশাপাশি প্রবল বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়িয়াই চলিতেছে। বর্তমানে স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া ও ক্রোয়েশিয়া চরম আবহাওয়া মোকাবিলা করিতেছে। স্লোভেনিয়ায় বিধ্বংসী বন্যার কারণে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতার পর হইতে দেশটি এমন বিপর্যয় দেখে নাই। এই দিকে গত মাসের মাঝামাঝিতে গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের দাবানল ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, দুই সপ্তাহেরও অধিক সময়ের প্রচেষ্টার পর দাবানল নিয়ন্ত্রণে আসে। অন্যদিকে কানাডায় বর্তমানে সক্রিয় হাজারখানেক অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ছয় শতাধিক নিয়ন্ত্রণের বাহিরে রহিয়াছে। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমের বেশ কিছু অঞ্চলেও দাবানল বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করিয়াছেন, ভূমির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে দাবানল আরও ঘন ঘন ও তীব্র হইবে। কারণ, সমগ্র বিশ্বেই চরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপ গাছপালা ও মাটি হইতে অনেক অধিক আর্দ্রতা টানিয়া লইতেছে। আবহাওয়ার এই শুষ্ক অবস্থা কাজ করিতেছে দাবানলের জ্বালানি হিসাবে। পৃথিবী যত উষ্ণ হইবে, বায়ুমণ্ডল তত অধিক আর্দ্রতা ধরিয়া রাখিতে পারিবে। ইহার ফলে খুব কম সময়ে ও ছোট এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাত হইবার ঘটনা বৃদ্ধি পাইবে। পাকিস্তানে গত বছরের জুলাই ও আগস্টে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে ৩ কোটিরও অধিক মানুষ বন্যার কবলে পড়িয়াছিল। গত কয়েক দিনে প্রবল বন্যা দেখা দিয়াছে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের আশপাশে। সেইখানে ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় প্লাবিত হইয়াছে বহু জায়গা, মৃত্যু হইয়াছে অন্তত ৩৩ জনের।

কী এক বিপর্যয়কর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি আমরা! বৈশ্বিক তাপমাত্রা এখন প্রতি বছরই অল্প অল্প করিয়া বাড়িবে। ইহাই চরম বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রাও আরও তীব্র হইবে। তাহার ফলে পরিবর্তন ঘটিতে পারে সমুদ্রস্রোতের। ফলে মৌসুমি বায়ুতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাহার ফলে কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হইতে পারে, অন্যদিকে কোথাও দেখা দিতে পারে ব্যাপক খরা। বৈশ্বিক জলবায়ুর উষ্ণায়নে আমাদের খুব একটা ভূমিকা নাই বটে; কিন্তু বিশ্ব যেহেতু বিশ্বগ্রাম, সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তন তথা উষ্ণায়নের অভিঘাত আমাদের উপরও নামিয়া আসিতেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাইলে মানুষ অনেক অধিক শহরমুখী হইতে পারে। ফলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সামগ্রিক চিত্র যথেষ্ট আতঙ্কের। এই সকল বিষয় মাথায় রাখিয়া দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা করা জরুরি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন