ঘরে বসে, বাইরে ঘুরতে ঘুরতেও দেখতে পাচ্ছি, ক্রিকেট-ঝড়ে কম্পিত নয়, খুশিতে ডগমগ বাংলাদেশ। উল্লসিত, উত্তেজিত বিশ্বের নানা প্রান্তের বাঙালি। বিশ্বকাপের ক্রিকেট-শরিক, (যোদ্ধা বলছি না, খেলাকে যুদ্ধ কেন বলব?) অন্যান্য দেশগুলোও নিঃসন্দেহে উত্সাহ আর খেলাপ্রেমের জোয়ারে ভাসছে।
ক্রিকেটে বাংলাদেশের উত্তরণ আর সাফল্যকে জড়িয়ে বঙ্গভাষীদের তাত্ক্ষণিকতার আনন্দ কতটা স্থায়ী হবে, ভবিষ্যেক কোন দিশা দেখাবে, এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে বাঙালির ভবিষ্যত্ নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, সংক্রামক আত্মকলহে বিভাজনের অনুপ্রবেশ নিয়ে চিন্তিত, তাঁরা ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রমাগত ঊর্ধ্বারোহণ ও ‘জয় বাংলা’র সচেতন আর সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের উচ্চতা আর সবিশেষ বিস্তারের লক্ষণ ভেবে খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করছেন।
ফুটবল আর ক্রিকেট গত কয়েক দশক জুড়ে, সমাজতত্ত্ব ও সমসাময়িক ইতিহাসচর্চার জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে। রামচন্দ্র গুহ থেকে লর্ড মেঘনাদ দেশাইয়ের মতো সামাজিক ইতিহাসের তীক্ষ পর্যবেক্ষকরা বলতে শুরু করেছেন, খণ্ডিত উপমহাদেশের পারস্পরিক প্রেমের শক্তি অর্জনে খেলার অবদান অসামান্য। সাধারণ দর্শকের একাংশ অনেক সময় অতি জাতীয়তার বিভ্রান্তিকর আবেগে আক্রান্ত হয়ে অযাচিত অঙ্গভঙ্গি, বা ভ্রুকুটির বিকারকে ছড়িয়ে দেন। এসব কুকথার লাগামহীন উচ্চারণকে সমাজ কি প্রশ্রয় দেয়? কলকাতার ইডেনে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলাকে ঘিরে পাকিস্তানি প্রতিভাকে, বহুবার বৃহত্তর দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে, করতালির হর্ষধ্বনি দিয়ে যে সম্মান দেখিয়েছেন, তা নির্বিশেষের অপ্রতিরোধ্য, অজেয় প্রেমের সাক্ষী হয়ে আছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের চমত্কার ‘পারফরম্যান্স’কেও টেলিভিশনের সামনে বসা দর্শক এবং সংবাদমাধ্যম সেভাবে বাহবা দিচ্ছে, অলরাউন্ডার সাকিবের ব্যাট-বলের ধামাকায় প্রাণিত হয়ে উঠছে—চিরন্তন শুভ্রতার এও আরেক স্বপ্নময়, ধারাবাহিক অভিজ্ঞান নয় কি?
খেলা সম্পর্কে জ্ঞান আমার সীমিত। এ ব্যাপারে এই অশিক্ষিতের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। কাগজ পড়ে শিখছি। খুঁজছি তার সৌহার্দ্য আর সীমান্তহীনতার তত্ত্ব ও অর্থ। এর সঙ্গে যাপিত, প্রবাহিত পেশার সম্পর্ক নেই। বরং দর্শকের মুখাবয়বের সুন্দর অভিমুখ দেখার চেষ্টা করছি। ২৪ জুন সোমবার রাতে, আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলার মুহূর্তে, পরের দিন সকালেও ঘুরতে বেরিয়ে এমন কিছু মনোহর অভিজ্ঞতা হয়েছে, যার অন্য নাম উল্লাস কিংবা সানন্দ চিত্কার অথবা তর্কপ্রবণ আলোচনা, তা পেশ করা দরকার। জরুরি উত্সাহিত দর্শকের স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহের ব্যাখ্যা। রাত সাড়ে ৮টা। টালিগঞ্জ এলাকায় বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। বহুদিন পর। সার্দান অ্যাভিনিউ হয়ে শতবর্ষের হেমন্ত মুখার্জির পূর্ণদেহের মূর্তির পাশ দিয়ে গাড়ি ডান দিকে মোড় নিচ্ছে। এক পাশে লেক। অন্যদিকে সারি সারি বাড়ি। সামনে মেনকা সিনেমা হল। মেনকা থেকে ডান দিকে মুদিয়ালি হয়ে প্রথমে ভাওয়াল মণ্ডল রোডে একজনের বাড়ি ছুঁয়ে গল্ফ ক্লাবে যাব। যেতে যেতে চায়ের দোকানে, বিভিন্ন ক্লাবে জটলা আর হইহুল্লোড় দেখে মনে পড়ল, আজ ক্রিকেটে আফগানদের সম্মুখীন বাংলার একাদশ বাঘ।
কাপড়ে বাঘের ছবি এঁকে মুদিয়ালির সীমারেখায় কয়েকজন নাচছে—দ্যাখ দ্যাখ আমাগো বাংলাদেশের ঝড়। ব্যাটে তখন সাকিব। উঁকি দিয়ে দেখলাম, কেউ কেউ টেবিল চাপড়াচ্ছে। সোনার বাংলা গাইছে। ঢোল বাজাচ্ছে দুই যুবক। আরো একটু এগিয়ে চায়ের দোকানেও বেলাগাম উল্লাস...আফগানরা পারবে না। উড়ে যাবে।
বন্ধুর বাড়িতে, গল্ফ ক্লাবে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। চনমনে লাগছে। শেষে কী দাঁড়ায় দেখতে হবে। ফেরার পথে অন্য রাস্তা। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ হয়ে বাইপাস কানেকটর ধরব। বড় বড় দোকানে ঝাঁপ। পাশের চায়ের দোকানে ভিড় আর সানন্দ গৌরব, মার আরেক ছক্কা। উড়িয়ে দে। ভাসিয়ে দে। কানে বাজল, সমস্বরের ‘জয় বাংলা’। উত্তেজনা আমাকেও স্পর্শ করছে। অনেকের হাতেই স্মার্টফোনে খেলা ভাসছে। থেমে থেমে দেখছি। হেদায়তকে বললাম, আস্তে চালাও। সামনে, একটু ভেতরে খেলার ক্লাব।
ক্লাব জুড়ে উল্লাসের ঢেউ, ধ্বনিতরঙ্গ বাইরেও। কিছুক্ষণ আগেই সাকিব ডেভিড ওয়ার্নারকে টপকে গেছেন। ক্রিজে মুশফিকুর রহিম। ওর ব্যাটেও ঝড় বইছে। একজন, মধ্যবয়সি কণ্ঠে জোর হাঁকিয়ে বললেন, মুশফিক মার আরো মার, ভাসিয়ে দে বাঘের বাচ্চা! ৮৩-র অর্জন নিয়ে মাঠ ছাড়লেন মুশফিকুর। দর্শকদের মুখে তখন অতর্কিত বিষণ্নতা, উত্সাহে ভাটা...কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারলেই তো শতরানে পৌঁছে যেতে বাছা! কিঞ্চিত আশাহত আমিও, বাংলাদেশ কি হেরে যাবে?
গাড়ির দরজা খুলে বসতেই বুঝতে পারলাম, ক্রিকেট হাওয়া আমাকেও ক্রমশ স্পর্শ করছে। আগের দিন ভারত-আফগানের খেলায়ও একই অনুভূতি টের পেয়েছি। বারবার শিউরে উঠছে পুলকজাগা দেহ। গাড়ি বাড়ির দিকে ছুটছে। ঝকঝকে রাস্তা। হকারহীন, রিকশাহীন। এখানে ‘আরম্ভ’র অফিস। সামনে চায়ের দোকানের সামনে ভিড়। মোবাইলের স্ক্রিনে সবার চোখ। ৫০ ওভার শেষ, বাংলাদেশ ২৬২ ছুঁতেই, পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণে কয়েকজন বলে উঠল, জয় বাংলা। বাড়ি ফিরে সরাসরি টিভির সামনে বসে পড়লাম।
দেখছি, দেখেই যাচ্ছি, কাবুলের নবজাগ্রত আত্মপ্রত্যয়ী খেলোয়াড়দের সাকিবের বল-ঝড়ে নাজেহাল। হার তাদের অনিবার্য। নাইবের ৪৭, সামিউল্লার ৪৯ ওঁদের বিপর্যয় ঠেকাতে পারল না। ২০০ রানেই ওঁরা খতম। মঙ্গলবার সকালে কাগজ দেখছি। প্রথমে আজকাল। চিত্তজয়ী হেডিং—ওয়ার্নারকে টপকে এক নম্বর, ব্যাটে-বলে সাকিব ধামাকা। খবরের সঙ্গে আলিঙ্গনবদ্ধ ছবিতে সাকিব-মুশফিকুরের ছবিতে পারস্পরিক অভিনন্দনের বিরল মুহূর্ত। সঙ্গে ক্যাপশন, প্রাণের মাঝে আয়। আনন্দবাজার খুললাম, শিরোনামে সাকিবের ব্যাট-বলের তুফান আর তাঁর বিজয়ী হাসির নিচে, বিশ্বকাপে তাঁর অমূল্য রেকর্ড।
ইংরেজি-বাংলা প্রতিটা সংবাদপত্রই এদিন সাকিবময়। তার মানে সোমবার রাতে, খেলার মুহূর্তে রাস্তায়, অনেকানেক ক্লাবে যে উত্সাহ আর আবেগের চালচিত্র দেখেছি, বাংলাদেশমুখী উল্লাস দেখছি, তাঁর সঙ্গে নিত্যদিনের সামাজিক আয়নাও (সংবাদপত্র) সহজে নির্দ্বিধায় গলা মেলাচ্ছে। সগৌরবে। স্বাভাবিক আনন্দে। এটা কীসের আভাস? দুই আলাদা রাষ্ট্রের বাসিন্দা হলেও একটি জাতির হূদয়ের স্বরের, তার মনোজাগতিক মহিমার—পরস্পরের আত্মার কাছাকাছি বসবাসের—একে-অন্যের অবিভাজ্য আনন্দকে ছুঁয়ে থাকার, উপভোগের সংকল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জাগ্রত চিহ্ন নয় কি? এখানেই কাজী নজরুল ইসলামের স্বপ্ন দিয়ে আঁকা ‘জয় বাংলা’র জয়ধ্বনি, প্রতিধ্বনি চওড়া হয় আরো। এখানেই সমস্ত ক্ষুদ্রতা আর সব ধরনের বিদ্বেষের পারজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। বেদনাময় পূর্বস্মৃতিকে পূর্ণতায় ভরে দেয়। আমাদের প্রেম আর আবহমান সংস্কৃতির বিকাশকে ঘিরে গড়তে চায়, জাগাতে চায় অনন্য মিনার।
n লেখক ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা
