সমাধান খাল সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৩, ০৬:০০

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরকে পরিচালনাকারী দুটি বৃহত্ সংস্থা হচ্ছে—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা বিষয়ে সিডিএ-কে দোষারোপ করছে চসিক। আবার চসিক-এর কথায় একমত পোষণ করছে না সিডিএ। জলাবদ্ধতা আদৌ নিরসন হবে কি না?—এমন প্রশ্ন নগরবাসীর মনে থেকেই যায়।

এই প্রজেক্টের কাজ চসিককে দেওয়া হলে তাদের নালা-নর্দমা করার অভিজ্ঞতা আছে; তারা করত। আবার এই বিষয়ে সিডিএ-র অভিযোগের তির—চসিক গত ১০ বছরেও বারাইপাড়া খাল খনন ও সংস্কার করতে পারেনি, তারা আবার এত বড় বাজেট কীভাবে পাশ করবে? বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন না হওয়ার অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে—

আমাদের যে নালা-নর্দমা, তার মধ্যে পানির তুলনায় ময়লার প্রবাহ বেশি। মানুষ ময়লা নালা-নর্দমায় ফেলে। নালা-নর্দমা ও ড্রেনগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করা যাচ্ছে না। এই ময়লাই চট্টগ্রাম নগরীর আজন্ম অভিশাপ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যান করার জন্য অনেক প্রজেক্ট এসেছে বিভিন্ন ধরনের। তাদের নিজেদের টাকা দিয়ে করে দেবে বলা হলেও চসিক সেই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে ময়লা ফেলার জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। পথের ওপরেই ময়লার স্তূপের আকার পাহাড়ের রূপ ধারণ করে! যতক্ষণ পর্যন্ত চসিক গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যান না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নালা-নর্দমা, ড্রেন পরিষ্কার হওয়া সম্ভব নয়। আর নগরবাসীর জলাবদ্ধতা অভিশাপও দূর হবে না। এই গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যান বাস্তবায়ন হলে—১. বিদ্যুত্ উত্পাদন সম্ভব হবে; ২. জাপানিজ কোম্পানি বিদ্যুত্ উত্পাদনে সহায়তা করবে; ৩. মানুষের বাসাবাড়ি থেকে ময়লা ক্রয় করা হবে। এছাড়া জানা যায়—গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যানে যে পরিমাণ ময়লা প্রয়োজন হবে, সেই পরিমাণ ময়লা চট্টগ্রামের নগরবাসী জোগান দিতে পারবে না। এই পরিকল্পনা আমাদের নাগালে থাকা সত্ত্বেও আমরা গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে পারছি না!

নগরীর নিম্নাঞ্চলের পানি নেমে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে চাকতাই খাল। সম্প্রতি চাকতাই খালের স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু খুবই সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে পানি নামার জায়গাটা। যেখানে নৌকায় যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই স্লুইস গেট পুনঃনির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। নিম্নাঞ্চলের পানি নামতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেই সেখানে ময়লা জমছে। এভাবে ময়লা জমতে জমতে একসময় স্তূপ হবে। ফলে পানি নামার পথে সৃষ্টি হবে বাধা। আর এতে জলাবদ্ধতা নগরজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে চাকতাই খালের তলা পাকা করেও বিশাল অর্থ খরচ হয়েছে। ৫৬০০ কোটি টাকার কাজের কথা থাকলেও ৩৩০০ কোটি টাকার যে কাজ হয়েছে, তা-ও দৃশ্যমান নয়।

এ থেকে বলা যায় যে, চসিক এবং সিডিএ প্রধানের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো যতক্ষণ পর্যন্ত সমাধান হবে না এবং যে নতুন প্রজেক্ট হয়েছে তার টাকা, যথাযথ কাজ যদি সম্পন্ন না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরবাসীর জলাবদ্ধতা নিরসনের ভোগান্তি দূর হবে না। আরেক তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৫৬০০ কোটি টাকার বাজেট পাশ হলেও তার কোনো ডিটেইলস প্ল্যান হয়নি। এই বাজেটের কাজ : যেমন কয়টা খাল সংস্কার বা খনন করতে হবে, এসবের কোনো নির্দিষ্ট হিসাবও হয়নি।

মূল কথা হচ্ছে—আমাদের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করে সিডিএ, চসিক, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ওয়াসা। কাজ হচ্ছে একটা, আর সংস্থা হচ্ছে চারটি। সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে তাহলে এই সমস্যা কেন? তারা কি আদৌও সমন্বয়ের ভিতরে কাজ করে নাকি সমন্বয়হীনতার মধ্যে দিয়ে কাজ করে?

পরিশেষে, এই জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত। নয়তো হাজার-হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও চট্টগ্রাম শহরে এই জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে না। সর্বোপরি গার্মেন্টস রিসাইকল প্ল্যান বাস্তবায়ন, কাজের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, নালা-নর্দমা ও ড্রেনে মানুষের ময়লা ফেলা ইত্যাদি গুরুত্ব দেওয়া না হলে আমরা কখনোই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে পারব না।

ইত্তেফাক/এএইচপি