রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর হাটে আড়াই কোটিরও অধিক অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হইয়াছে একটি দ্বিতল বাজার। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে সরকারের এলজিইডির বাজার প্রকল্পের আওতায় এই ভবন নির্মাণ করা হইয়াছে। ইহা একটি শুভ উদ্যোগ কোনো সন্দেহ নাই; কিন্তু বাজারটি এখনো চালু না হওয়ায় ভবনটি এখন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়িয়াছে। বৈদ্যুতিক বাতি, বেসিন, পানির কল ইত্যাদি নষ্ট হইয়া যাইতেছে। ইহা একটি দৃষ্টান্তমাত্র। দেশে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হইতেছে ঠিকই; কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সময়ে তাহার সুফল পাইতেছে না। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি টাকায় নির্মিত হইয়াছে অনেক হাসপাতাল, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, ফায়ার স্টেশন প্রভৃতি; কিন্তু এই সকল প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হইলেও তাহা ব্যবহৃত না হওয়ায় অবহেলায় পড়িয়া থাকায় নষ্ট হইয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। মেহেরপুরের মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ হাটে একই প্রকল্পের আওতায় আরেকটি বাজার ভবন নির্মিত হইয়াছে। সেইখানেও বিরাজ করিতেছে একই দশা। ভবনটি অলস পড়িয়া থাকায় দোকানের শাটার, টাইলস, মেঝে ইত্যাদিতে ত্রুটিবিচ্যুতি দেখা দিয়াছে। ইহাতে যেমন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হইতেছে না, তেমনি সরকার বঞ্চিত হইতেছে রাজস্ব হইতে।
জানা যায়, এলজিইডি দেশের ৬৪ জেলার সব উপজেলায় মোট ৫০৭টি বাজার ভবন নির্মাণ করিতেছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। প্রতিটি বাজার নির্মাণে ব্যয় হইতেছে আড়াই হইতে ৩ কোটি টাকা; কিন্তু দোকান বরাদ্দের বিধিমালা জটিলতায় একটি ভবনও চালু করা যায় নাই। ছয় বছরেও এমন বিধিমালা লইয়া কেন জটিলতা থাকিবে তাহা বোধগম্য নহে। এই ধরনের প্রকল্প গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করিবার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। জনগণ ইহা হইতে সুফল পাইতে শুরু করিলে কৃষি ও অকৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সুবিধা বাড়িবে। গ্রাম পর্যায়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি হইবে এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরিতে ইহা সহায়ক হইবে। প্রতিটি বাজার চারতলার ফাউন্ডেশন দিয়া তৈরি করা হইয়াছে। ইহাও একটি ভালো দিক। ইহাতে ভবনগুলি পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হইবে। ইহাতে গ্রামীণ ক্রেতাবিক্রেতাদের আর রৌদ্র কিংবা বৃষ্টিতে ভিজিয়া ক্রয়বিক্রয় করিতে হইবে না; কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবনগুলির নির্মাণকাজ যথাযথ হয় নাই। ভবনে ফাটল, নিম্নমানের পাইপ, কেবল ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রহিয়াছে। খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ—আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে ইহা ধরা পড়িয়াছে। এই সকল ত্রুটিবিচ্যুতি দূর করিয়া অবিলম্বে নূতন নির্মিত গ্রামীণ বাজার ভবনগুলি চালু করা একান্ত প্রয়োজন।
সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ দফায় দফায় বৃদ্ধি করিবার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ শেষ হয় না। আবার যখন কাজ শেষ হয়, তখন ঠিক সময়ে তাহা চালু করা হয় না। এমনকি জনপ্রতিনিধি কর্তৃক উদ্বোধন হওয়ার পরও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকিয়া যাইতে দেখা যায়। ইহাতে এই সকল স্থাপনা যেমন নষ্ট হইতেছে, তেমনি জনগণের অর্থের অপচয়ও হইতেছে। ইহার জন্য কেন জবাবদিহিতা নাই? কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা হইয়াছে ঠিকই; কিন্তু তাহা পরিচালনার জন্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। কিংবা বিভিন্ন সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয় নাই। যখন এইরূপ ভবন তৈরির প্ল্যান পাশ হয়, তখন হইতেই জনবল নিয়োগসহ সর্বপ্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে অসুবিধা কোথায়? আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে এমন করুণ দশা হইত না নিশ্চয়ই। জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থেই বিষয়টি এখন গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করিতে হইবে।
