সুন্দরবনে প্রজনন মৌসুমেও বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩, ০৫:০০

প্রজনন মৌসুমেও পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে চলছে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার। এতে বনের গহিনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও মাছের পোনা প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। জেলে নামের একশ্রেণির দুর্বৃত্ত এ কাজ করছে। ফলে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ধরা পাশ পারমিট বন্ধ রাখা শুধু কাগজে কলমে সীমাবন্ধ থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের ৩১ শতাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে জলাভূমি। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের বৃহত অংশ জুড়ে রয়েছে মৎস্যসম্পদ। জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ৪৫০ নদনদী। আর এই নদনদীতে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ। এর মধ্যে ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়াসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী। সরকার প্রতি বছর এই মত্স্যসম্পদ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে থাকে। বর্তমান সুন্দরবনে চলছে মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ জন্য জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস বনে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা এবং জেলেদের পাশ পারমিট বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কিছু  জেলে নামক দুর্বৃত্তরা কম পরিশ্রমে অধিক মুনাফার আশায় অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করছেন। আর বনের অভ্যন্তরে প্রতিটি খালে ও নদীতে বিষ প্রয়োগে করছেন মাছ শিকার। এমনকি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত নিষিদ্ধ খালেও।

জানা গেছে, মধ্য ভাটার সময় খালের গোড়ায় জাল পেতে খালের আগায় বিষ দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে মাছগুলো ছটফট করতে করতে দুর্বল হয়ে ভাসতে ভাসতে জালে এসে আটকা পড়ে। এ কাজে সাধারণত ভারতীয় অবৈধ রিপকট, ক্যারাটে, হিলডন, ওস্তাদ ও বিষ পাউডারসহ বিভিন্ন বিষ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এতে একদিকে যেমন বনের গহিনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও মাছের পোনা ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে বিষমিশ্রিত পানি পান করে বাঘ, হরিণসহ বনের নানা বন্যপ্রাণীও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। আবার ঐ বিষমিশ্রিত মাছ খেয়ে জনসাধারণ পেটের পীড়াসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে লোকদেখানো অভিযানে দুই একজন দুর্বৃত্ত বিষসহ হাতেনাতে আটক হলেও কখনো থেমে নেই এ কাজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, পূর্ব বন বিভাগের ভদ্রা নদী, কোড়ামারী, টেংরামারী, বাইনতলা, মনসা, ছোট জোংড়া, ঝনঝনিয়া, কুদিখালী ও কালীর খালসহ বিভিন্ন খালে বনসংলগ্ন এলাকার অসাধু জেলে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছে। প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার গোনে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এই কাজের সঙ্গে বন বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত বলে তারা অভিযোগ করেন।  

ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চোরের কাজ চুরি করা আর আমাদের কাজ পাহারা দেওয়া। তার পরও গত আড়াই মাসে পাশ পারমিট বন্ধের সময়ে জেলেদের জাল, নৌকাসহ সরঞ্জামাদি জব্দ করে মোট ১৪টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চার জন জেলেকে কোর্টে চালান দেওয়া হয়েছে।  

উপজেলার বানীশান্তা ইউপি চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায় জানান, সুন্দরবন এবং বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে বন বিভাগকে আরও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রথমে বনের বিভিন্ন নদী, খাল এবং নিষিদ্ধ এলাকায় বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার বন্ধ করতে হবে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদেব বালা বলেন, বিষমিশ্রিত মাছ খেলে মানুষের কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষমিশ্রিত পানি খেলে বিভিন্ন প্রাণীরও একই সমস্যা হতে পারে।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল জানান, যে খালে বা জলাশয় বিষ প্রয়োগ করা হয়, কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সেখানে কোনো মাছ প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়। 
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) রানা দেব বলেন, এ পর্যন্ত অনেক জেলের নৌকা, মাছ ও বিষসহ জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অসংখ্য জেলেকেও আটক করে মামলা দিয়ে কোর্টে চালান দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত এমন প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এমএএম