জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ প্রাক-পর্বে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসমুদ্রে তর্জনী উঁচিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে...।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিটি লাইনই গণজাগরণের উদ্দীপ্ত চেতনাবাহী। জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐ নির্দেশনা শুধু মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকেই উদ্দীপ্ত করেনি, সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক সৈনিকদেরও উজ্জীবিত করেছিল। ‘শত্রুর মোকাবিলা’ করতে হবে শব্দগুলোয় গঠিত বাক্যে বঙ্গবন্ধুর সমরদর্শন এবং প্রতিরক্ষাচিন্তার যে প্রতিফলন ঘটেছিল, তা কতটা প্রাজ্ঞ এবং দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন—তা আজকের বাস্তবতায় আরো বিশেষভাবে গভীর মর্মার্থের অনুসন্ধান দেয়।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে যেসব মন্ত্রণালয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, এর মধ্যে প্রতিরক্ষার বিষয়টি ছিল অগ্রভাগে। এ দেশের সাধারণ মানুষের কাতার থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও সাধারণ সেনারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ধারণ করে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পর্বে প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধুর পরিচয় দেয়। তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অনেকেই প্রাণ বিসর্জন দেন। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে এবং যুদ্ধোত্তর ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনাক্রমে মিত্রবাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য নজির হয়ে আছে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সমর দর্শনের পাশাপাশি জাতীয় প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যেভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে—তাও যুগ-যুগান্তর ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সশস্ত্র বাহিনী দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় যাতে দ্রুত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, সেজন্যও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা সব সদস্যকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মাত্র আড়াই বছরের মাথায় সমগ্র সেনাবাহিনীকে বিগ্রেড, গ্রুপ, ফোর্সে বিন্যাস করে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া করেছিলেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ১২টি মিগ বিমান সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে গ্রহণ করে নবযাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৭২-৭৫, তা-ও পূর্ণ সময় নয়; উল্লিখিত ঐ আংশিক সময়ের মধ্যে এ এন ২৪ বিমান, একটি ভিআইপি এমআই ৮ হেলিকপটার, চারটি এমআই ৮ হেলিকপটার, ইআইআরভি ১১ রাডারসহ আরো কিছু আনুষঙ্গিক সামরিক বিমান ও উপকরণ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আজ অনেক বেশি বিকশিত। ঐ সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিমান বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা ও সেনাকে তত্কালীন সোভিয়েত রাশিয়া এবং চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা করেন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরো সংক্ষিপ্ত পরিসরে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মাত্র ১৭ জন কর্মকর্তা ও ১৭ জন নাবিক নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবন্ধুর সমর দর্শন ও দূরদর্শী প্রতিরক্ষা চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কর্তব্য-দায়িত্বের বিষয়াবলি অনুমোদন করে। আজ সেই নৌবাহিনীও অনেক বিকশিত। আর সেনাবাহিনীর কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এই বাহিনীর কাঠামো এবং কর্মতত্পরতা যেন দিগন্তবিস্তৃত। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসারি সম্পৃক্ত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা ব্যাপক ভূমিকা পালন করছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ নানা ক্ষেত্রে জনগণের জন্য বিস্তৃত হয়েছে তাদের পরিষেবা। সেনাবাহিনীর মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি বঙ্গবন্ধু উদ্বোধন করেন ১৯৭৪ সালের ৩ মার্চ। তখন প্রতিরক্ষা বাহিনীর মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য ট্যাংকসহ আধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে সব বাহিনীর ঊর্ধ্বে স্থান দেন। সর্বাধিক কার্যকরী ও নিয়মতান্ত্রিক একটি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন বোধ করে বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত, তারা এ লক্ষ্যে কার্যকর অবকাঠামো গঠন করতে কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে (পরবর্তীকালে জেনারেল) কেবিনেট মিনিস্টারের মর্যাদাসহ বাংলাদেশ ফোর্সেস-এ প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করে। একই সঙ্গে কর্নেল (অব.) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফের্সেস-এর চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রথম সরকার, অর্থাত্ মুজিবনগর সরকার যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত সৈনিক এবং আন্দোলন-সংগ্রামের নির্ভরযোগ্য সহযোদ্ধা। আমাদের সেনাবাহিনীর মূলত জন্ম যুদ্ধক্ষেত্রে অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধের সময় যে যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ এবং ঐ যুদ্ধের মহানায়ক অর্থাত্ সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বর্তমান সরকার, ধারাবাহিক তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই দূরদর্শিতার সড়ক ধরেই সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর আধুনিকায়নসহ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছেন। একাত্তর পূর্ব বঙ্গবন্ধুর সমর চিন্তা তার ঘোষিত ছয় দফার মধ্য দিয়ে প্রথম আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়, যে ছয় দফা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত। ছয় দফা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানি মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি গঠনসহ পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ নিরাপত্তাকল্পে অন্যান্য বিষয়ও তিনি সন্নিবেশিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে, ১. আনসার বাহিনীকে ইউনিফর্মধারী সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তর; ২. ইপিআর অর্থাত্ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (বর্তমানে বিজিবি) বাহিনীকে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনস্থ করা; ৩. পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা স্থাপন করা; ৪. পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখার ভেতর নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে রাখা। ছয় দফায় উল্লিখিত বিষয়গুলো বঙ্গবন্ধু সংযোজন করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যেই এবং এর অন্তর্নিহিত তাত্পর্য যে কতটা ব্যাপক ছিল, নতুন করে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অধ্যায় পর্যালোচনা করলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, মর্যাদাপূর্ণ দেশরক্ষা বাহিনী গড়ার ক্ষেত্রে তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা একে অপরের পূরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। কতিপয় সজাত্যদ্রোহীর বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া সশস্ত্র বাহিনীর ললাটে যে কলঙ্গতিলক এঁকেছিল, এবং তত্কালীন কুচক্রী স্বার্থান্বেষী সরকার ছিল যে মর্মন্তুদ অধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষক, ঐ কদর্য অধ্যায়ের বিলম্বে হলেও অপসারণ করেছে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর সমর দর্শন ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চিন্তা আমাদের সমৃদ্ধির যে সড়ক নির্মাণ করে দিয়েছিল, তা উত্তরোত্তর চওড়া হচ্ছে—এটি অবশ্যই গর্বের। শুধু উন্নয়নযজ্ঞেই নয়, দেশের প্রতিটি দুর্যোগ ও ক্রান্তিকালে জনগণের পাশে সশস্ত্র বাহিনী দাঁড়িয়েছে দৃঢ়ভাবে। সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক দুর্দিনের বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে যথাসাধ্য অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, যা আজ তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অব্যাহত রেখেছেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রতিরক্ষাবাহিনীগুলোর গোড়াপত্তন যথার্থভাবেই বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, যার ফলে বাহিনীগুলো ভারসাম্যপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ভাবে গড়ে ওঠে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে আজ আমরা গর্বিত অংশীদার। এ সবই বঙ্গবন্ধুর সমর দর্শনের দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিফলন।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
