এটা অনস্বীকার্য যে, রাজধানী ঢাকার নগরায়ণ অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। উচ্চ জনঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাজধানী ঢাকা বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১৪ আগস্ট সোমবার রিকটার স্কেলে ৫.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়ে গেল। যদিও উত্পত্তিস্থল ছিল ভারতের করিমগঞ্জ। সিলেটের কাছাকাছি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা তথা বাংলাদেশে তেমন কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্পের কবলে পড়েনি। ১৮৫০ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পাঁচটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৫৬ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি অঞ্চল। বিশেষ করে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজধানী ঢাকার গুরুত্ব এবং তাত্পর্য আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই নগরে বাস করে, এমন মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশে নগরবাসী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশের মতো। ৬৭ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান ৬০ শতাংশের মতো। ঢাকার জনসংখ্যা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় (২০২১-২০৪১) উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই নগরবাসী হবে। সেই সময় দেশের মোট জনসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ঢাকার জনঘনত্ব প্রতি একরে ৩০০ থেকে ৮০০ জন। এই অতিমাত্রায় জনঘনত্ব শহরটিকে বসবাসের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সম্প্রতি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার ৭৩ শতাংশ অবকাঠামোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ঢাকা শহরে পাবলিক প্লেস ও রাস্তার জন্য জমির পরিমাণ মাত্র ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অনেক এলাকায় রাস্তা এতটাই সরু যে দুটি রিকশা একই সঙ্গে চলাচল করতে পারে না।
ঢাকা শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার জন্য মূল যে সমস্যাটি কাজ করছে তা হলো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাব। আমাদের নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে। যেমন :ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) আছে, স্ট্রাকচারাল প্ল্যান আছে। কিন্তু এই পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যেসব সংস্থা আছে বা যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা খুব সীমিত পরিসরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। যেটুকু বাস্তবায়ন করে তাও পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে পারে না। প্রণীত আইন প্রয়োগে তাদের বিভিন্ন রকমের সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা রয়েছে। যেসব স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে তাতে নিয়মকানুন উপেক্ষিত হচ্ছে। অর্থাত্ আইন আছে; কিন্তু তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আমাদের রয়েছে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২। এছাড়া দেশের প্রত্যেকটি এলাকার জন্য রয়েছে আলাদা ভবন নির্মাণ বিধিমালা। সারা দেশের জন্য রয়েছে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড। কিন্তু এসব আইন ও বিধিমালা থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত। নগরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন রয়েছে। এর পরে রয়েছে পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি করপোরেশন। এখন নগর অঞ্চলের জন্য যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব কি সিটি করপোরেশনের, নাকি মিউনিসিপ্যালিটি করপোরেশনের নাকি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেসব প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ আছে তাদের; যেমন : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ? এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। এ নিয়ে এক ধরনের দ্বৈততা আছে। আর দ্বৈত কর্তৃত্বের অধীনে কোনো কাজই সঠিকভাবে সম্পাদিত হতে পারে না। এছাড়া রয়েছে আরবান ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টরেট। তারাও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও আলাদাভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেসব প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ আছে, তারা মূলত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এ বিল্ডিং কোডের উল্লেখ আছে। কিন্তু বিল্ডিং কোডে যা কিছু আছে তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয় না। অর্থাত্ তারা প্রয়োগ সীমাবদ্ধ রাখছে শুধু বিধিমালায় যা বলা আছে তার মধ্যে। তাও আবার বিধিমালায় যা বলা আছে তার সবই তারা প্রয়োগ করছেও না।
পরিদর্শকরা কয়টি ভবন ভাঙবেন? কোনো একটি ভবন পরিদর্শন ও ভাঙার উদ্যোগ নিলে এজন্য ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন হয়। পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজন হয়। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ জোগাড় করা সহজ কাজ নয়। এভাবে প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহ করে তারা মাসে কতটি ভবন পরিদর্শন করতে পারবেন? চাইলেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। অনেক সময় ভবন মালিকগণ পরিদর্শক টিমের ওপর হামলা চালায়। আর কোনো ভবন পরিদর্শন করে ত্রুটি পেলেই তা ভেঙে ফেলা সম্ভব হয় না। এভাবে রাজধানী ঢাকা শহরে প্রতিনিয়তই বিধি ভঙ্গ করে ভবন নির্মিত হচ্ছে। আমরা ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি শহরের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছি। শুধু রাজধানীর কথাই-বা বলি কেন, দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর বা জেলাশহরেও নগরায়ণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে এসব ভবন হয়তো তেমন একটা সমস্যার সৃষ্টি করছে না। কিন্তু কিছু দিন পরই এসব ভবন জনগণের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে ভবন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করবে, সেটাই নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেই অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। তবে ঢাকা শহরে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। এখানে জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ধারণা করা হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই নগরবাসী হবে। আমরা যদি শহরবাসীকে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। উন্নয়ন যেটা অর্জিত হবে তা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন হবে না। আর একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু উন্নয়ন হলেই একটি দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারে না, যদি সেই উন্নয়ন টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী না হয়। তাই প্রতিটি দেশই চেষ্টা করে, যাতে তাদের অর্জিত উন্নয়ন টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এটা কেউই অস্বীকার করবে না। কিন্তু সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। যদি শহরকেন্দ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনামাফিক করা না যায়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এক সময় প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুসারে ইতিমধ্যেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কার্যকর মধ্যবিত্ত দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবে। জাতিসঙ্ঘের একটি সহযোগী সংস্থার রেটিং অনুসারে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পেয়েও তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। উন্নয়নকে টেকসই করতে না পারার কারণে তারা আবারও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় চলে গেছে। প্রতিবেশী দেশ নেপাল একসময় উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান লাভ করেছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার ব্যর্থতার কারণে তাদের আবারও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই এই উন্নয়ন যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। উন্নয়ন যেন টেকসই হয়। আর টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে আমরা যে নগরায়ণ করছি তা অবশ্যই আধুনিক এবং পরিকল্পিত হতে হবে।
কোনো শহর যদি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে সেই নগরীর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত সবচেয়ে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে। কোনো শহর যদি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে দুই ধরনের সমস্যা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে নিত্যদিনের সমস্যা। যেমন :যানজট, পানির সমস্যা, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি। আর একটি হচ্ছে কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি হলে সেই সমস্যা মোকাবিলা করা। দুর্যোগও এখন প্রায় নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে প্রায়শই অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ রাস্তাই এত সরু যে, সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। রাজধানীর আর একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ জলাভূমি ভরাট করে সেখানে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে শহরে জলাভূমি কমে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। ফলে কোথায় অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হলে পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। অগ্নিদুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ দায়ী। শহরে জলাবদ্ধতা একটি জটিল সমস্যা। সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরীর অধিকাংশ রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। সহজে পানি নিষ্কাশিত হয় না। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ যেসব অত্যাবশ্যক স্থাপনা আছে সেগুলোর নিরাপত্তাও আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের সমুদ্র বন্দর ও স্থল বন্দরগুলো যদি ভূমিকম্প বা অন্য কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাহলে যে ক্ষতি হবে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না।
লেখক: অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: এম এ খালেক
