গতকাল গণভবন হইতে ভার্চুয়ালি সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি প্রকল্প উদ্বোধন করিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সময় তিনি বলেন যে, সকলে সম্মানের সহিত বাঁচিয়া থাকিবার সুযোগ লাভ করিবে। এইরূপ পেনশনের ফলে দূর হইবে বৈষম্য। বৃদ্ধ বয়সে অনেকে যে পরিবারের নিকট বোঝা হইয়া দাঁড়ান, তাহাদের সেই পরিস্থিতি আর তৈরি হইবে না। এই শুভ উদ্যোগের জন্য আমরা সরকারপ্রধানকে ধন্যবাদ জানাই।
ইহার পূর্বে গত রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. গোলাম মোস্তফা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জারি করা হয় ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা-২০২৩’। বিধিমালায় বলা হইয়াছে, প্রতিটি স্কিমের বিপরীতে নির্ধারিত পরিমাণ চাঁদা দেওয়া সাপেক্ষে মাসিক পেনশনের প্রাপ্যতা অর্জিত হইবে। ১৮-৫০ বত্সর বয়সি এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রধারী সকল নাগরিকই পেনশন স্কিমে নিবন্ধিত হইতে পারিবেন। গতকাল হইতেই অনলাইনে এই প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। অবশ্য বিশেষ বিবেচনায় ৫০-ঊর্ধ্ব নাগরিকও এই স্কিমে যুক্ত হইতে পারিবেন। কোন স্কিমে এবং কী পরিমাণ চাঁদা দিলে মাসিক কত টাকা করিয়া পেনশন পাওয়া যাইবে তাহা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে বিধিমালায়। এই জন্য টানা ১০ বত্সর চাঁদা পরিশোধ করিতে হইবে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা তপশিলি ব্যাংকে জমা দেওয়া যাইবে চাঁদা। চাঁদাদাতা নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনে চিকিত্সা, গৃহনির্মাণ, গৃহ মেরামত এবং সন্তানদের বিবাহ-শাদির জন্য তহবিলে জমাকৃত অর্থের ৫০ শতাংশ ঋণ হিসাবে তুলিতে পারিবেন। চাঁদাদাতার মৃত্যুর পর তাহার নমিনি বা উত্তরাধিকারী পেনশন পাইবেন ১৫ বত্সর পর্যন্ত। উল্লেখ্য, অর্থ বিভাগের আওতাধীন সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করিতেছে। এই ক্ষেত্রে চার প্রকারের স্কিম রহিয়াছে—প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা। প্রথমটি প্রবাসী বাংলাদেশি, দ্বিতীয়টি বেসরকারি চাকুরিজীবী, তৃতীয়টি রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতিসহ স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য এবং চতুর্থটি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যাহাদের বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকার কম।
আমরা জাতীয় এই পেনশন স্কিমের সাফল্য কামনা করি। আমরা মনে করি, দেশের ১৮ হইতে ৫০ বত্সর বয়সি সকল নাগরিককে পেনশন-সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত একটি মহত্ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ইহাতে জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটিবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিসিএসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গিয়াছে, দেশে মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা ৫ কোটি ৮৭ লক্ষ। তাহার মধ্যে সরকারি চাকুরিজীবী ৫ শতাংশ আর বেসরকারি খাতে নিয়োজিত রহিয়াছে ১০ শতাংশ। এই ১৫ শতাংশ হইল দেশের প্রাতিষ্ঠানিক খাত। অবশিষ্ট ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, যাহাদের কোনো নিয়োগপত্র নাই। তাহারাও পেনশন স্কিমের আওতাভুক্ত হইতেছেন, যাহা একটি সুখবরই বটে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা প্রবর্তনের অঙ্গীকার রহিয়াছে। সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে হইলেও এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ফলে দেশের মানুষ উপকৃত হইবে। দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়িতেছে ক্রমশ। এমতাবস্থায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রয়োজনীয়তা বলাই বাহুল্য। যদিও ইহা নতুন কোনো ধারণা নহে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতেও সাম্প্রতিক কালে এইরূপ স্কিম চালু করা হইয়াছে। নেদারল্যান্ডসসহ অনেক উন্নত দেশে এই স্কিম কার্যকর রহিয়াছে।
মূলত কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা হইতেই সর্বজনীন পেনশন স্কিমের চিন্তার উদ্ভব হইয়াছে। ইউরোপের কল্যাণমূলক অনেক রাষ্ট্রে এই ব্যবস্থাটি বিদ্যমান থাকায় সেখানকার নাগরিকগণ অনেকটা নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করিতেছেন। স্কিমটি পরিচালনা করাও এমন কোনো কঠিন কাজ নহে। বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা ইতিমধ্যেই তৈরি হইয়াছে। আমরা মনে করি, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নাগরিকদের জন্য ইহা একটি বড় সুযোগ। তাই এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা কাম্য। সর্বজনীন পেনশন স্কিম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হউক—ইহাই আমরা কামনা করি।
