বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক তার ও তাহার মৃত্যুফাঁদ

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৩০

ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবর হইতে জানা যায়, কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া এক গৃহবধূ মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। ইজিবাইকের চার্জারের তার ছিঁড়িয়া থাকিবার কারণে তাহার সংস্পর্শে আসিলে তাহার মৃত্যু হয়। একই দিন ১৮ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুরে একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধ বাঁশ কাটিতে গেলে বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে লাগিয়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া মারা যান। এইখানে বাঁশবাগানে বিদ্যুতের তার আসিল কীভাবে? ইহার পূর্বে লালমনিরহাটের সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া মারা যান একজন কৃষক। তিনি দুপুরে তাহার জমিতে কাজ করিতেছিলেন। এমন সময় পাশের জমিতে পড়িয়া থাকা বিদ্যুতের তারে জড়াইয়া তিনি মারা যান। বাসাবাড়ি, খেতখামার, রাস্তাঘাট কিংবা বনে-জঙ্গলে তথা যে কোনো স্থানে এইভাবে বিপজ্জনকভাবে বিদ্যুতের ছিঁড়িয়া যাওয়া তার পড়িয়া থাকিবে কেন?

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া মৃত্যুর সংখ্যা এই বর্ষাকালে অধিক হারে বৃদ্ধি পায় আমাদের দেশে। বিশেষত বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া হতাহত ও পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। এই ব্যাপারে জনসচেতনতার যেমন অভাব রহিয়াছে, তেমনি ইহার জন্য অনিরাপদ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনও দায়ী। বৃষ্টিতে জমিয়া থাকা পানির মধ্যে বিদ্যুতের তার ছিঁড়িয়া পড়িয়া থাকিলেও অনেকে না বুঝিয়া রাস্তায় চলিতে গিয়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। বর্ষাকালে অনেক সময় ল্যাম্পপোস্টে হাত দিতে গিয়াও কেহ কেহ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। অনেক সময় নদনদীর ধার দিয়া বিদ্যুতের হাইভোল্টেজের যে তার টানা হয়, তাহাও খেতে-খামারে পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। আবার গ্রাম-গঞ্জে বাঁশের খুঁটিতে বিদ্যুতের তার টানানোরও নজির রহিয়াছে এই দেশে। ইহা কতটা বিপজ্জনক তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির চাপের নিকট নতি শিকার করেন বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন। তাহাদের বক্তব্য হইল, বাঁশের খুঁটিতে হইলেও একবার যখন বিদ্যুতের লাইন দেওয়া হইয়াছে, তখন একদিন ঠিকই শক্ত খুঁটি বসানো হইবে। এই সকল বাঁশের খুঁটি ঝড়বৃষ্টির সময় হইয়া উঠে বিপজ্জনক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন গাছ দিয়াও বিদ্যুতের তার টানিতে দেখা যায়। বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ঘরের টিনের চালের নিচে দেখা যায় ট্রান্সফরমার। বিদ্যুতের তারগুলি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির ছাদ বা টিনের চাল ছুঁইছুঁই করে। কোনো কোনো স্থানে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নিচুতে ঝুলিয়া থাকিতে দেখা যায়। ইহাতে বোঝা যায়, বিদ্যুৎ প্রশাসনের অভ্যন্তরে আসলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা রহিয়াছে। জনগণের মধ্যেও রহিয়াছে চরম অসচেতনতা।

সাধারণত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া মারা যাওয়ার প্রতিটি ঘটনার পর প্রতিক্রিয়াগুলি হয় একপ্রকার চেনা চিত্রনাট্য। হয় কেহ তাহা আমলেই নেন না, অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন কিছুটা নড়িয়া চড়িয়া বসেন। বড় বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তাহার পর আবার যেইকার সেই পরিস্থিতি দাঁড়াইয়া যায়। ইহাতে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। রাস্তায় পড়িয়া থাকা বিদ্যুতের বিপজ্জনক তার দিনের পর দিন পড়িয়া থাকিতে পারে না। ইহা দ্রুত সরানো দরকার। স্থানীয় সরকারের উচিত এই ব্যাপারে নজরদারি বৃদ্ধি করা। নাগরিকদের মধ্যেও যে বেপরোয়া মনোভাব রহিয়াছে তাহা দূর হওয়া প্রয়োজন। বিপজ্জনক উপায়ে বিদ্যুতের লাইন কেন নিতে হইবে? কেন নিজের ও অপরের নিরাপত্তা লইয়া আমরা চিন্তা করিব না? সকল কিছু কেন ছাড়িয়া দিব ভাগ্যের উপর? আবার নাগরিকদের উপর সকল দোষ চাপাইয়া বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজদের গাফিলতি ঢাকিতে পারে না। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নিরাপত্তা অবশ্যই তাহাদের নিশ্চিত করিতে হইবে। চারি পার্শ্বে এমন মৃত্যুফাঁদের উপস্থিতি মোটেও কাম্য নহে। সাধারণ নাগরিকদের জীবন কেন এতটা অরক্ষিত থাকিবে? মানুষের জীবন লইয়া এই উদাসীনতা দূর না হইলে এবং এই ব্যাপারে আমাদের মধ্যে সচেতনতা গড়িয়া না উঠিলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনা যে ঘটিতেই থাকিবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন