দুই দশক পরও কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরে আসেনি

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:২২

আজ ২ ডিসেম্বর। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ২১ বছর পূর্তি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষে তত্কালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লার সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। তবে পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই দশক পরও তিন পার্বত্য জেলায় কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরে আসেনি। বরং অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে পার্বত্য জনপদে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। চুক্তি মানা না মানা নিয়ে বেড়ে যায় ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত। নতুন করে সৃষ্টি হয় পাহাড়িদের ৪টি সশস্ত্র গ্রুপ। উপদলীয় সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় চুক্তির অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আর শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হলেও ভূমি জরিপসহ কয়েকটি ইস্যুতে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলোতে বিদ্যমান সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে পাহাড়ের পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

তথ্য সূত্র মতে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গত ২১ বছরে প্রত্যাগত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পুনর্বাসন, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারসহ স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত, ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দেড় যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয় ও শর্ত আজো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে বলে অভিযোগ জনসংহতি সমিতির নেতাদের। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার এমপি বলেন, ‘সরকারের তরফ থেকে শান্তিচুক্তির কিছু অংশ যে বাস্তবায়ন হয়েছে তা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়।

এদিকে বাঙালিদের কয়েকটি সংগঠন এখনো পার্বত্য চুক্তিকে একপেশে ও অসম বলে আন্দোলন করে আসছে। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের আব্দুল মজিদ বলেছেন, ‘একটি একপেশে চুক্তির কারণে পাহাড়ের বাঙালিদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে; তা হিসাব করার মতো নয়। এই চুক্তির মাধ্যমে শুধু উপজাতীয়দের স্বার্থই সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাঙালিদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে সবক্ষেত্রেই অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি অবলিম্বে ভূমি কমিশন আইন বাতিল এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের দাবি জানান।’ পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মাসুম রানা বলেন, ‘সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চুক্তিতে বাঙালিদের সব ধরনের অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। ’

এদিকে ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) মুখপাত্র মিটুন চাকমা বলেন, ‘১৯৯৭ সালে চুক্তি হলেও পাহাড়ে ভূমি সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়ে গেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে।’

শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও পরীবিক্ষণ জাতীয় কমিটির অন্যতম সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা দাবি করেন, ‘শরণার্থী ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কাজ প্রায়ই শেষ হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা আর স্থানীয় পুলিশ ছাড়া চুক্তির অধিকাংশ ধারাই ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করে স্ব স্ব জায়গায় পুনর্বাসন কাজটাই শুধু বাকি রয়েছে।

কর্মসূচি: বর্ষপূর্তি উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে কোনো বাঙালি সংগঠনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি পাওয়া যায়নি।  সকাল সাড়ে ৮টায় পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ হতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে টাউন হলের সামনে ডিসপ্লে হবে। বিকালে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও দিনটি উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিভক্ত দুটি অংশই কর্মসূচি দিয়েছে। তবে খাগড়াছড়ি সদরে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মসূচি পাওয়া গেলেও সন্তু লারমা নিয়ন্ত্রণাধীন জনসংহতি সমিতির কর্মসূচি পাওয়া যায়নি।