নীলফামারী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় জনবলসংকট চরম আকার ধারণ করছে। চার ভাগের এক ভাগ কর্মচারী দিয়ে চলছে দেশের বৃহত্তম এ কারখানার কার্যক্রম। বিকল্প অস্থায়ী নিয়োগপদ্ধতিতে টিএলআর (কাজ নেই, মজুরি নেই) শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হলেও ছয় মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় রয়েছে কাঁচামালের তীব্র সংকট। এসব কারণে কারখানাটিতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বেশির ভাগ সময়ই মালপত্র কেনার দরপত্রে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা হয়। ফলে কোচ ও ওয়াগন মেরামতের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান সময়মতো আসে না। অনেক সময় নিম্নমানের মালামালও চলে আসে। সেগুলো ঠিক করতে গিয়ে অতিরিক্ত জনবল, কর্মঘণ্টা ও বিদ্যুতের অপচয় হয়।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কারখানাটিতে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীর পদ ২ হাজার ৮৫৯টি। এর মধ্যে মাত্র ৭১৬ জন কর্মরত। অর্থাৎ ২ হাজার ১৪৩ পদ শূন্য রয়েছে। এই জনবল-সংকটের কারণে কারখানায় ক্যারেজ মেরামতের প্রতিদিনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন তিনটি কোচ মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও হচ্ছে দুটি কোচ। ২৯টি শপে ৭৪০টি যন্ত্র পরিচালনায় নেই প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি শপে প্রয়োজনের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন কাজ চলছে। উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কিংবা নষ্ট কোচ মেরামতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না কারিগররা। দক্ষ জনবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে অনেক যন্ত্রপাতি।
জানা যায়, আসাম-বেঙ্গল রেলপথ ঘিরে ১৮৭০ সালে স্থাপিত হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। ১১০ দশমিক ২৯ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত কারখানাটিতে রয়েছে ২৮টি শপ (উপকারখানা)। এখানে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ ও মালবাহী যানের (ওয়াগন) মেরামত কাজ করা হয়। পাশাপাশি রেলওয়ের স্টিম রিলিফ ক্রেন ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্যারেজ এবং ওয়াগন মেরামতের কাজও হয়ে আসছে। এ ছাড়া ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের ১ হাজার ২০০ রকমের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এ কারখানায়।
কারখানাটি রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে হলেও সারা দেশের রেলওয়ের চাহিদা পূরণ করে। ক্যারেজ শপের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম জানান, ক্যারেজ শপে ৩৯৫ পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৮৫ জন। জনবল-সংকটে কাঙ্ক্ষিত উত্পাদনসহ সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে মেইনটেন্যান্সে শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ ট্রেনের রেক মেরামত ও বিদেশ থেকে আনা নতুন ট্রেনের অ্যাসেম্বলিং কাজে বিঘ্ন ঘটছে।
রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের কারখানা শাখার সম্পাদক শেখ রোবায়তুর রহমান বলেন, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী একটি ক্যারেজে চার বছর অন্তর সাময়িক সংস্কার (পিওএইচ) এবং ১২ বছর অন্তর সাধারণ সংস্কার (জিওএইচ) করার কথা। কিন্তু জনবল-সংকট ও কাঁচামালের অভাবে বহু ক্যারেজ এখন মেরামত ছাড়াই বছরের পর বছর পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, জনবল-সংকট দূর করতে পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। এ ছাড়া সময়মতো কাঁচামালের সরবরাহ করতে হবে। তবেই এই কারখানার উৎপাদন আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) সাদিকুর রহমান বলেন, চলতি বছরে ২৮৯ জনকে খালাসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও উল্লেখসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময় কাজ করে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, জনবল-সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে টিএলআর শ্রমিক দিয়ে আবার এ কারখানা কর্মমুখর হয়ে উঠবে।
